নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। টানা আন্দোলন, ব্লকেড, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। রোববারের সংঘর্ষের জেরে এবার গাজীপুর সদর মেট্রো থানায় অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তবে সোমবার রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।সোমবার (১৮ মে)সকাল থেকেই ডুয়েটের প্রধান ফটকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্ট দখলে নেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
“ডুয়েট থেকে ভিসি চাই”, “বহিরাগত ভিসি মানি না”, “অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব চাই”—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। দিনভর চলে অবস্থান, বিক্ষোভ ও ব্লকেড কর্মসূচি। ফলে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাদের দাবি, বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ডুয়েটের বাস্তবতা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অভিজ্ঞ অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ দিতে হবে।
সোমবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ ও হাসানুর রহমান অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বহিরাগতদের এনে হামলা চালানো হয়েছে। তারা বলেন, “গণতান্ত্রিক দাবিকে রক্তাক্ত করা হলেও আমরা পিছু হটব না। বহিরাগত ভিসির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ডুয়েটের শিক্ষককেই ভিসি করতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, রোববারের সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। গেইট ভেঙে ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগও তোলেন তারা। আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি হামলাকারীদের বিচার দাবি করা হয়।
অন্যদিকে উপাচার্য কার্যালয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে ডুয়েট শিক্ষক সমিতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ খসরু মিয়া বলেন, “অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে ভিসি নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষক সমাজের রেজোল্যুশন রয়েছে। তবে সরকার যাকে নিয়োগ দিয়েছে তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও সম্ভব নয়।” তিনি সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান।
শিক্ষক সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও মতপ্রকাশের জায়গা। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার থাকলেও সহিংসতা ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের তথ্যমতে, সংঘর্ষে দুই শিক্ষকসহ অন্তত ১৮ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এদিকে বিকেলে ক্যাম্পাসের বাইরে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে ডুয়েট ছাত্রদল নবনিযুক্ত ভিসিকে স্বাগত জানায়। তবে সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়ালে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কিছু কর্মী পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার ডুয়েট ক্যাম্পাসে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষে অন্তত ২০ শিক্ষার্থী ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, “ইটপাটকেল নিক্ষেপে আমিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছি। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেনি, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে নবনিযুক্ত ভিসির অনুপস্থিতি ঘিরে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রোববার ইউএনও কার্যালয়ে যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করার পর সোমবার তিনি আর ক্যাম্পাসে আসেননি। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও প্রচারণা ছড়িয়ে পড়লেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এবং ডুয়েটের স্বার্থ রক্ষার লড়াই। তবে দ্রুত সংকট নিরসন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গভীর অচলাবস্থার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :