পবিত্র ঈদের আনন্দ যেন সমাজের কোনো মানুষ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য প্রতি ঈদের আগে অসহায় ও দুস্থদের মাঝে সরকারি ভাবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে স্লিপের মাধ্যমে বিশেষ মানবিক সহায়তা বা ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়। উৎসবের মুখে গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই মানবিক উদ্যোগেই এবার হানা দিয়েছে দুর্নীতি। কাগজে-কলমে ১০ কেজি লেখা থাকলেও উপকারভোগীদের দেওয়া হচ্ছিল বালতি মেপে ৯ কেজির মত। আর এভাবে ঈদের আগে অসহায় মানুষের হক থেকে কেটে নেওয়া উদ্বৃত্ত চাল লুকিয়ে ফেলা হচ্ছিল ইউনিয়ন পরিষদের গোডাউনেই।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফ চাল বিতরণে এমনই এক সুক্ষ্ম কারচুপির চিত্র উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) চাল বিতরণ শেষে তালাবদ্ধ গোডাউন থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১৭ বস্তা চাল পাওয়া যায়। অপরদিকে, এক কর্মকর্তার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের পর স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি ঈদের আগে দুস্থ পরিবারের তালিকা করে তাদের হাতে নির্দিষ্ট স্লিপ বা কার্ড তুলে দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার মহাদেবপুর ইউনিয়নে সেই স্লিপ জমা নিয়ে সরকারি ভিজিএফের চাল বিতরণ শুরু হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কার্ডধারীকে ডিজিটাল বা মানদণ্ডযুক্ত ওজন যন্ত্রে মেপে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। কিন্তু শুরু থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে কোনো ওজন যন্ত্র ব্যবহার না করে একটি নির্দিষ্ট ‘বালতি’ দিয়ে চাল পরিমাপ করা হচ্ছিল।
শারাসিন গ্রাম থেকে আসা ভুক্তভোগী লুৎফর রহমান জানান, তার পরিবারের দুটি স্লিপের বিপরীতে ২০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও বালতি দিয়ে মেপে দেওয়ায় তারা প্রায় ২ কেজি চাল কম পেয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, উৎসবের মৌসমে অসহায় মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে, প্রতি কার্ডে ১ কেজি করে চাল কম দিয়ে কয়েকশ স্লিপ থেকে বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে এই ‘বালতি-কৌশল’ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, চাল বিতরণ কার্যক্রমের শেষভাগে এসে ঘটনার মোড় ঘোরে ভিন্ন দিকে। ইউপি সদস্যরা যখন দাবি করছিলেন চাল শেষ, ঠিক তখনই স্থানীয় বাসিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের মূল গোডাউনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে স্থানীয়দের চাপে প্রশাসনিক কর্মকর্তার উপস্থিতিতে গোডাউন খোলা হয়। সেখানে কোনো হিসাব ছাড়াই অতিরিক্ত প্রায় ১৭ বস্তা (আনুমানিক ৮৫০ কেজি) চাল মজুত পাওয়া যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গোডাউন খোলার পরপরই উপস্থিত ওই প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে হাতে নগদ টাকা নিয়ে এক দফাদারের (গ্রাম পুলিশ) কাছে হস্তান্তর করতে দেখা যায়। এরপর তিনি দ্রুত চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রবেশ করেন।
গোডাউনের চালের বিষয়ে ওই কর্মকর্তা জানান, দুপাশে যথাক্রমে ১০ ও ৭ বস্তা চাল রয়েছে, যা দফাদারদের দিতে হবে। তবে স্থানীয়দের গাণিতিক হিসাবে এই দাবিতে বড় ধরনের অসঙ্গতি মিলেছে। ১০ জন দফাদারের জন্য ১০ কেজি করে বরাদ্দ থাকলেও সর্বোচ্চ ১০০ কেজি চাল লাগার কথা। কিন্তু গোডাউনে মজুত ছিল তার চেয়ে বহুগুণ বেশি চাল। বিকেল ৩টার মধ্যে চাল শেষ হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরও এত বিপুল পরিমাণ চাল গোডাউনে থেকে যাওয়া ‘বালতি-কারচুপি’র মাধ্যমে জমিয়ে রাখা উদ্বৃত্ত চালের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সরকারি চাল বিতরণের সময় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু মহাদেবপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আবজাল হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা পর্যন্ত যখন চাল বিতরণ চলছিল, তখন সেখানে কোনো ট্যাগ অফিসার ছিলেন না।
২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আতোয়ার রহমান দাবি করেন, বিকেল ৩টার মধ্যে চাল শেষ হয়ে যায় এবং গোডাউনে কোন চাল বা বস্তুা ছিল না । তিনি একজন ট্যাগ অফিসার উপস্থিত থাকার দাবি করলেও রহস্যজনকভাবে তার নাম বলতে পারেননি। ইউপি সদস্যদের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারের রহস্যময় ভূমিকা এই অনিয়মের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বিতরণ প্রক্রিয়ায় এতসব অসঙ্গতি এবং গোডাউনে অতিরিক্ত চালের উপস্থিতি হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও মহাদেবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান সম্পূর্ণ দায় অস্বীকার করেছেন। সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, "আমার ইউনিয়নে কোনো অনিয়ম হয়নি।"
তবে মাঠ পর্যায়ের এই অনিয়মকে সহজভাবে দেখছে না উপজেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মণিষা রাণী কর্মকার বলেন, "মহাদেবপুর ইউনিয়নের ভিজিএফ চাল বিতরণের অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
আপনার মতামত লিখুন :