দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলায় চলতি অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের কর্মচঞ্চলতা ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট ৪৫টি কনটেইনারবাহী জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে। এসব জাহাজ থেকে সফলভাবে ২৮ হাজার ২৪১ টিইইউএস (TEUS) কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় একটি নতুন রেকর্ড।
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, আধুনিক ইয়ার্ড সুবিধা, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং দ্রুত পণ্য খালাস ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর কাছে মোংলা বন্দরের গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোংলা বন্দরের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট ১০ হাজার ৮৮০টি রিকন্ডিশন গাড়ি সফলভাবে খালাস করা হয়েছে।
আমদানিকারকদের দাবি, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক দ্রুত ডেলিভারি সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে মোংলা বন্দরকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া গাড়ি নিরাপদে খালাস, কম ঝুঁকি এবং দ্রুত প্রসেসিং সুবিধাও এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কনটেইনার ও গাড়ি ছাড়াও অন্যান্য সাধারণ কার্গো মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য খালাস করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, সার, কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, পাথর এবং খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্য।
এতে দেশের শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, পশুর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং এবং নাব্যতা বৃদ্ধির ফলে এখন ৯ মিটারের বেশি ড্রাফটের বড় জাহাজও সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারছে।
এছাড়া নতুন অ্যাঙ্কর বার্থ স্থাপন ও আধুনিক অপারেশন ব্যবস্থার কারণে জাহাজ জট প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু হওয়ায় পণ্য খালাসের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জেটি সম্প্রসারণ, আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ স্থাপন ও রেল সংযোগ স্থাপন।
এই প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে মোংলা বন্দর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নয়, বরং ভারত, নেপাল ও ভুটানের ট্রানজিট বাণিজ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক হাবে পরিণত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশন সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে মোংলা বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার একটি আধুনিক ও স্মার্ট সমুদ্রবন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আপনার মতামত লিখুন :