পুলিশে মেধাবীদের বঞ্চনা : দক্ষ নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকিতে প্রশাসন, নীতিনির্ধারকদের নীরবতায় গভীর শঙ্কা

নিজস্ব সংবাদদাতা , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় নতুন এক আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি, পদায়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনে এখনো সক্রিয় থাকা পূর্বের সুবিধাভোগী চক্রটি পরিকল্পিতভাবে জাতীয়তাবাদী ঘরানার মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখছে, যা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং সামগ্রিক শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি অতিরিক্ত আইজিপির প্রমোশন সরকারি জিও পত্রজারীতে ভীষণ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

পদোন্নতি ও পদায়নে বৈষম্য: চেইন অব কমান্ডে ভাঙন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত সরকারের শাসনামলে যারা পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, তাদের পরিকল্পিতভাবে মূলধারার বাইরে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সময়েও সেই ধারা অব্যাহত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জ্যেষ্ঠতা (Seniority) লঙ্ঘন করে নিয়মবহির্ভূতভাবে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করার ফলে ক্ষোভ বাড়ছে বাহিনীর ভেতর।

এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে গতকাল ৪ জুন ডিআইজি আলী আকবর খান স্বেচ্ছায় অবসরের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া ডিআইজি সৈয়দুর রহমান, ডিআইজি ড. মোঃ আক্কাছ উদ্দিন ভূঁইয়া, ডিআইজি ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান এবং ডিআইজি মাহমুদুর রহমানের মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পদোন্নতিবঞ্চিত রয়েছেন।

১৫ তম বিসিএস পুলিশ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এভাবে পাশ কাটিয়ে জুনিয়র পুলিশ  কর্মকর্তাদের পদোন্নতি  দেওয়ার ফলে পুলিশ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. নাজমুল করিম খান ও ড.  আশরাফুর রহমানের প্রতিকারহীন আর্তনাদ  

পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো বা অভিযোগের ভিত্তি ছাড়াই ডিআইজি ড. নাজমুল করিম খানকে সাময়িক বরখাস্ত রাখা হয়েছে। তার সার্ভিস রেকর্ড সন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও তাকে পুনর্বহাল না করার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একইভাবে, অতিরিক্ত আইজিপি ড. আশরাফুর রহমানের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফ্যাসিবাদী আমলে দীর্ঘ সময় কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে তিনি ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের আবেদন জানালেও এখনো কোনো সুরাহা পাননি। অথচ, বিগত সরকারের সুবিধাভোগী অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনের উচ্চপদে বহাল থেকে এখনো প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ষড়যন্ত্রের শঙ্কা ও প্রশাসনিক নৈরাজ্য 

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা চক্রটি মূলত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, “আমরা ব্যক্তিগত অনুগ্রহ চাই না, আমরা চাই প্রশাসনিক নিয়ম ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। জ্যেষ্ঠদের অসম্মানিত করে কনিষ্ঠদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হলে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।”

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি অবিলম্বে পুলিশ প্রশাসন থেকে ফ্যাসিবাদী দোসরদের চিহ্নিত করে তাদের প্রভাবমুক্ত করতে না পারে, তবে এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটের রূপ নিতে পারে। মেধার মূল্যায়ন ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ প্রয়োগই এখন এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।

প্রত্যাশা: শুদ্ধি অভিযান ও স্বচ্ছতা 

পুলিশ বাহিনীকে একটি আধুনিক, জনবান্ধব এবং পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা অপরিহার্য। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা এখনো বিশ্বাস করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা এই প্রশাসনিক নৈরাজ্য কাটিয়ে পুলিশ বাহিনীকে পুনরায় সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে—এমনটাই এখন সর্বমহলের প্রত্যাশা।

প্রতিবেদকের মন্তব্য: পুলিশ বাহিনীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং কর্মকর্তাদের মনোবল অটুট রাখতে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত জ্যেষ্ঠতার তালিকাটি পুনরায় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

Advertisement

Link copied!