‘ডিমার্কেশন’ নাকি জমি গিলবার ফাঁদ!

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০ জুন, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

ফাইল ফটো

মতিউর রহমান খান, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে:

সংরক্ষিত বনের জমি জবরদখল করার নতুন এক প্রশাসনিক মারপ্যাঁচের নাম ‘ডিমার্কেশন’ বা সীমানা নির্ধারণ। আপাতদৃষ্টিতে একে আইনি প্রক্রিয়া মনে হলেও, ভেতরে চলছে এক সুক্ষ্ম খেলা। যেখানে অনেক প্রভাবশালী খেলোয়াড় যুক্ত এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য—বনের ‘নিষ্কণ্টক’ বা ঝামেলামুক্ত জমি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।

এই সীমানা নির্ধারণের খেলায় বনের শতভাগ নিষ্কণ্টক ও মূল্যবান জমি তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রভাবশালীদের হাতে। আর বিপরীতে, বন বিভাগের ভাগে কাগজে-কলমে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইতিমধ্যে জবরদখল হয়ে যাওয়া কিংবা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের জমি। উদাহরণস্বরূপ—কোনো একটি দাগে যদি ১০ একর জমির মধ্যে ৮ একর আগে থেকেই জবরদখল হয়ে থাকে এবং মাত্র ২ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকে, তবে ডিমার্কেশনের নামে ওই নিষ্কণ্টক ২ একর জমি সুকৌশলে ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বন বিভাগ নিজের জমিতেই দিনে দিনে বাস্তুহারা হয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ডিমার্কেশনের খেলায় কখনই বনের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি; বরং প্রতিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্র। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করেছে কোটি কোটি টাকার গোপন লেনদেন।

২০১১ সালে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি মৌজায় এমনই এক ‘সীমানা খেলা’র মরণ কামড় বসে বনের বুকে। এই মৌজারই বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম—যিনি এলাকায় ‘বাউন্ডারি শহীদ’ নামে সর্বজনবিদিত।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মৌজার বিবদমান ৪৩৮ নম্বর দাগে মোট জমির পরিমাণ ১১১.৬৪ একর। এর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১২.৬৪ একর, খাস জমি ১.৮৯ একর এবং বন্দোবস্তকৃত জমি ১৩.৮৫ একর। অবশিষ্ট বিশাল ৮৩.৬৩ একর জমির প্রকৃত মালিক বন বিভাগ।

তৎকালীন ভালুকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের নেতৃত্বে একটি ডিমার্কেশন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে সেই কমিটি ‘বাউন্ডারি শহীদ’-এর বসতবাড়ি, খামার ও পুকুর-জলাশয়ের অংশটিকে কাগজে-কলমে বন বিভাগের জমি হিসেবে চিহ্নিত করে। আর বিপরীতে, বনের আসল নিষ্কণ্টক গজারী বন ও বাগানের জমিগুলো চিহ্নিত করে শহীদের নামে। কমিটি শহীদের পক্ষে এই সীমানা নির্ধারণ করার পরপরই বনের বিশাল গজারী বাগান সাবাড় করে ফেলা হয়। এখন বনের সেই জায়গায় শোভা পাচ্ছে বাউন্ডারি শহীদের বিশাল আমের বাগান।

অন্যদিকে, কৌশলগত কারণে বন বিভাগ কিন্তু শহীদের মূল বসতবাড়িতে হাত দিতে পারেনি। ফলে ৪৩৮ দাগের সিংহভাগ জমিই এখন কার্যত শহীদের দখলে। সম্প্রতি বন বিভাগের কয়েকজন সৎ কর্মকর্তা এই সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ নিলে শহীদ তাতে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়ান। শহীদের পাল্টা যুক্তি—"এই জমি আমার পূর্বপুরুষের বসতভিটা, এটা কীভাবে বনের হয়?" আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে অকাট্য মনে হলেও, তদ্বিধায় তার পৈত্রিক সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ কতটুকু আর তিনি বাস্তবে কতটুকু ভোগদখল করছেন—সেই হিসাব আজ পর্যন্ত কেউ নেয়নি বা নেওয়ার সাহস করেনি। উল্টো বন বিভাগকে বিবাদী করে আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন শহীদ, যার আইনি বেড়াজালে আটকে গেছে বনের ভবিষ্যৎ।

স্থানীয়দের দাবি, এই লুণ্ঠনের মূল অনুঘটক ছিলেন তৎকালীন ভালুকা রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল হাশেম খান। সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন রয়েছে, হাশেম খান এই সীমানা নির্ধারণের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক বাণিজ্য করেছেন এবং এর কিছুদিন পরেই তিনি অবসরে চলে যান। অবশ্য অনিয়মের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বন বিভাগ পরবর্তীতে তার অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা সাময়িকভাবে আটকে দেয়।

এই ডিমার্কেশনের মাধ্যমে বন বিভাগকে আরও এক উপায়ে পঙ্গু করা হয়েছে। একই দাগের বিপুল পরিমাণ বনভূমিকে এক জায়গায় না রেখে ৭টি পৃথক ও বিচ্ছিন্ন খণ্ডে ম্যাপে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানার জমি দাগের যেকোনো একপ্রান্তে নির্দিষ্ট করে দিলে বনের জমি নিষ্কণ্টক থাকত এবং তা রক্ষা করা সহজ হতো। কিন্তু তা না করে বনের পেটের ভেতরে ভেতরে ব্যক্তিমালিকানাকে জায়গা দেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে বিট কর্মকর্তা আব্দুর রফিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শহীদের খামার আর পুকুর দেখানো হয়েছে বনের নামে, আর আমাদের যে জীবন্ত গজারী বাগান ছিল, সেটা মার্ক করে দেওয়া হয়েছে শহীদের নামে। বনের জমিগুলো যদি এক ব্লকে বা একদিকে থাকত, তবে আমরা সীমানা প্রাচীর দিয়ে সহজে রক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু এখন বনের মাঝে মাঝে ব্যক্তিমালিকানা থাকায় তারা একটু একটু করে বনের জমি গিলে খাচ্ছে।"

অতীতে দেখা গেছে, চতুর জবরদখলকারীরা বনের ভেতরে বসে দিনে দিনে চারপাশের সরকারি জমি কেটে নিজের রাজত্ব প্রসারিত করে। আর এই অসম লড়াইয়ে বারবার পরাজিত হচ্ছে বন বিভাগ। ক্ষেত্রবিশেষে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা বা ঘুষের বিনিময়ে বনের জমি অন্যহাতে তুলে দিচ্ছে খোদ বন বিভাগেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এভাবেই হয়তো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মল্লিকবাড়ি বন বিট। এখনই যদি শক্ত হাতে এদের দমন করা না যায়, তবে অন্য বিটগুলোও একদিন বাউন্ডারি শহীদদের ভোগবিলাসে চলে যাবে।

অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের বন সংরক্ষক রকিবুল হাসান মুকুল। তিনি জানান, দেশব্যাপী বনের জমি ডিজিটাল ও নির্ভুলভাবে ডিমার্কেশন করার জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই কমিটিতে বন বিভাগসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থাকবেন। আধুনিক ম্যাপ ও মার্কিংয়ের কাজ শেষ হলেই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম বা অভিযান চালানো হবে।

কেন্দ্রীয় বন বিভাগের এই কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে স্থানীয় ভূমিদস্যুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও প্রকাশ্যে তারা এখনো পেশিশক্তি ও হুমকির মহড়া দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে—তাদের কথা না শুনলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্বত্য খাগড়াছড়িতে বদলি করে দেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইতিপূর্বে বাউন্ডারি শহীদের নামে অনেক মামলা হলেও রহস্যজনক কারণে প্রতিবারই আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করে রাখা হয়েছে। মামলার নথিতে কখনো শহীদের নিজের নাম, কখনো বাবার নাম, আবার কখনো ঠিকানায় ইচ্ছাকৃত ‘ভুল’ রাখা হয়েছে। আর এই করণিক ভুলের সুযোগ নিয়েই আদালতের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বন বিভাগের এই মূর্তিমান আতঙ্ক।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে আবেদন করতে হয়। ডিসি তখন একজন রাজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। সেই কর্মকর্তা বন বিভাগের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সরজমিনে ব্যক্তিমালিকানার জমি মেপে চিহ্নিত করে দেন এবং একটি স্কেচ ম্যাপ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ভালুকার এই মৌজায় সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে খোদ বনভূমিকেই গিলে খাওয়ার নকশা অনুমোদিত হয়েছে।

Link copied!