নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর তদবির ও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের একাধিক সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানা এলাকায় গত তিন মাসে বিভিন্ন মামলার আসামিদের পক্ষে প্রায় ৭০০টি তদবির এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ভালুকা নয়, ময়মনসিংহ রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় আসামি গ্রেপ্তারের পর তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ ও চাপ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এবং রাজনৈতিক নেতারা গ্রেপ্তারকৃতদের পক্ষে সুপারিশ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা সেই চাপ উপেক্ষা করলে তাদের বিরুদ্ধে বদলির হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ রেঞ্জের চার জেলার অন্তত ১৯টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনার পর বিভিন্ন ধরনের তদবির ও চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওসি বলেন, “দিনরাত পরিশ্রম করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করি। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরই বিভিন্ন মহল থেকে তদবির শুরু হয়। এতে অনেক সময় দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।”
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, থানাগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য অনিয়ম বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজন বা রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরাসরি মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে মামলার অগ্রগতি বা আসামিদের বিষয়ে তথ্য জানতে চান। এতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলার বিভিন্ন থানায় এ ধরনের তদবিরের ঘটনা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ভালুকা মডেল থানায় তদবিরের সংখ্যা সর্বাধিক বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ত্রিশাল, কোতোয়ালি, মুক্তাগাছা, গফরগাঁও, নান্দাইল, হালুয়াঘাট ও ফুলপুর থানাকেন্দ্রিক এলাকায়ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর থানায় নিয়মিত যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির এক নেতা অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে তদবির করে থাকে, তাদের পরিচয় সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রমাণ পেলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের পর তাদের পক্ষে একাধিক তদবির করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ওসিরা তা আমলে না নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে থানাগুলোতে অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :