নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ঘিরে তদবিরের চাপ, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে উত্তাল ময়মনসিংহ রেঞ্জ

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬, ০১:৫২ এএম

ময়মনসিংহ রেঞ্জজুড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুনরায় চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর পুলিশের এই ঝটিকা তৎপরতা যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক তদবির, চাপ ও ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার ‘ঘুষ বাণিজ্য’-এর অভিযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন থানায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের ছাড়িয়ে নিতে স্থানীয় কিছু বিএনপি-জামায়াত নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থানা পুলিশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছেন। কোথাও চলছে মানসিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আবার কোথাও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আসামিদের মুক্ত করার অপচেষ্টা চলছে।

তদবিরের ‘স্রোত’ ও সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য:  পুলিশ প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। গ্রেপ্তারের পরপরই শুরু হয় তদবিরের ছড়াছড়ি। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীরা আসামিদের নিজেদের আত্মীয় বা কর্মী দাবি করে থানায় ভিড় করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক শীর্ষ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন "আওয়ামী লীগ বা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেউ গ্রেপ্তার হলেই থানায় শত শত লোক তদবির করতে আসে। কেউ বলে এমপির লোক, কেউ বলে বিএনপির নেতা। এই সুযোগে কিছু সুবিধাবাদী চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।"

পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, গত তিন মাসে বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৫০০ শত তদবিরের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এমন তথ্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা সদস্যরা সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ  ক্ষেত্রে বিএনপি এবং বাকিগুলোতে জামায়াত ও অন্যান্য স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা জীবন বাজি রেখে আসামিদের ধরি, আর ধরার পরপরই শুরু হয় তদবির। পরে লোকমুখে শুনি, আমাদের নাম ভাঙিয়ে কিছু দালাল চক্র লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরেছে।"

ভালুকায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ‘গ্রেপ্তার আতঙ্ক’ ও অর্থ বাণিজ্য:  ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, আসামি গ্রেপ্তারের পর তদবিরের চাপ অস্বাভাবিক। তবে সব চাপ উপেক্ষা করে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আসামিদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের নাম ব্যবহার করে 'গ্রেপ্তার আতঙ্ক' দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে একটি চক্র। মাস্টারবাড়ী এলাকার এক ভুক্তভোগী বৃদ্ধ জানান, তার ছেলে কোনো পদধারী নেতা না হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রলীগ তকমা দিয়ে স্থানীয় এক দালাল তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পরে বিষয়টি 'মীমাংসা' হয়েছে বলে জানানো হয়। তিনি বলেন আমি এক উকিল স্যারের মাধ্যমে ঢাকায় অভিযোগ করেছি। 

এ বিষয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, "স্থানীয় কিছু টাউট-বাটপার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে আমরা শুনেছি। তবে এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।"

ভালুকায় গত ১ জুন রাতে থানা চত্বর থেকে আটক এক ছাত্রলীগ কর্মীকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে এবং ৬ জুন বড় ডোবা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার এক আওয়ামী লীগ নেতাকে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।  ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন হয়েছে। যদিও ওসি জাহিদুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

একই চিত্র দেখা গেছে গফরগাঁও, নান্দাইল ও ফুলপুরেও:

 গফরগাঁও: দুই আওয়ামী লীগ নেতাকে ছেড়ে দিতে ৯০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ।  নান্দাইল:এক নেতাকে ছাড়াতে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

ফুলপুর: ছাত্র লীগের তকমা দিয়ে এক যুবককে আটকের পর আড়াই লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

কলকাঠি নাড়ছেন এমপিরা, নজরদারিতে গোয়েন্দা সংস্থা: একাধিক থানার ওসির দাবি, কিছু সংসদ সদস্য (এমপি) ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা সরাসরি ফোন করে কিংবা হোয়াটস্যাপ কলের মাধ্যমে আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন।

একটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পক্ষে তদবিরকারী ও অর্থ লেনদেনে জড়িত ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাদের ফোন নম্বর ও কার্যক্রম ট্র্যাক করা হচ্ছে। অপরাধীদের ছাড়ানোর চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওসি পদায়ন ও ঘুষের পুরনো বিতর্ক: 

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত এক বছরে ময়মনসিংহ রেঞ্জের কয়েকজন ওসির বিরুদ্ধে আসামিদের সুবিধা দেওয়া এবং ওসি পদায়নকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলার সাবেক পুলিশ সুপার কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওসি পদায়নে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদায়নগুলো বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সম্পন্ন হয়েছিল।"দুর্নীতি করলে ছাড় নেই"।

সার্বিক বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার কামরুল হাসান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন: আমার জেলায় কোনো অপরাধী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি নিজে গোপনে এসবের খোঁজখবর নিচ্ছি। আমি নিজে দুর্নীতি করি না এবং কাউকেও দুর্নীতি করতে দেব না।"

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি আতাউর কিবরিয়ার কাছে এই ঘটনায় মন্তব্য জানতে চাইলে সরকারি নাম্বারে বারবার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করা হলেও তিনি  রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠানো হলেও কোন উত্তর মেলেনি।

Advertisement

Link copied!