রাশিয়ায় একের পর এক মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও কমিউনিটি প্রতিনিধির গ্রেফতার দেশটির মুসলিম সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মে মাসজুড়ে পরিচালিত এই অভিযানে অন্তত আটজন আলেম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি আটক হন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে ঘটনাগুলো সীমিতভাবে প্রকাশ পেলেও স্বাধীন ও নির্বাসিত গণমাধ্যমে এগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রুশ নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। পুলিশের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ধর্মীয় নেতা আখমাদ তাঙ্গিয়েভ, মর্দোভিয়ার মুফতি রয়াল আসেনভ এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ, সারাতভ, তাতারস্তান ও মারমানস্ক অঞ্চলের আরও কয়েকজন মুসলিম কমিউনিটি নেতাকে বিভিন্ন সময়ে আটক করা হয়।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রশাসনিক অবাধ্যতা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। কিছু গণমাধ্যম দাবি করেছে, কয়েকজনের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়া ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী ও উগ্র-ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো এসব গ্রেফতারকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, রাষ্ট্র অবশেষে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে যারা দেশের ঐতিহ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন ব্লগ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে মুসলিম ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা দেখা গেছে।
এ সময় আরেকটি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম)-এর শীর্ষ নেতা দামির মুখেতদিনভ। তার কার্যালয়ে টাঙানো একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্মকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী মহলে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, চিত্রকর্মটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বার্তা বহন করছে। বিতর্ক বাড়তে থাকলে তিনি শেষ পর্যন্ত চিত্রকর্মটি সরিয়ে ফেলেন।
ঘটনার পুরো সময়ে ডিইউএম তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। সংগঠনের প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন পরে এক বিবৃতিতে ডিইউএমকে চরমপন্থা, বিদেশি প্রভাব বা উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, এসব প্রচারণা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং দেশের প্রতিপক্ষের স্বার্থকে শক্তিশালী করছে। তবে তিনি গ্রেফতার হওয়া আলেমদের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
এই ঘটনাগুলোর পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়ায় আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতে নামাজ সীমিত করার একটি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুফতি গাইনুতদিন এই বিলের বিরোধিতা করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে খোলা চিঠি পাঠান। তার মতে, আইনটি মুসলমানদের সাংবিধানিক ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং দেশে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বসবাস করে, যা ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যা। দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিন মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বড় মসজিদ নির্মাণ, মুসলিম নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এই সম্পর্ক ধরে রাখা হয়েছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী ও অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বক্তব্য আরও জোরালো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি ও চাপও বেড়েছে। সাম্প্রতিক গ্রেফতার এবং নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে যে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, রাশিয়া কি এখন সেই নীতি থেকে সরে আসছে? মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বিতর্ককেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
আপনার মতামত লিখুন :