আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে অবশেষে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই সিটি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গত ১২ জুন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বেনজীরের গ্রেপ্তার শুধু একজন ব্যক্তির পতনের ঘটনা নয়; বরং এর মাধ্যমে সামনে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সহযোগী সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, বেনজীর আহমেদ এককভাবে এত বড় দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছেন কি? নাকি তার পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত সহযোগী চক্র, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে সহায়তা করেছে?
লজিস্টিক শাখার ১৩ কর্মকর্তাকে ঘিরে নতুন আলোচনা: বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখায় দায়িত্ব পালনকারী ১৩ জন কর্মকর্তা ও তিনজন পুলিশ পরিদর্শককে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন রয়েছে, ৮১২ কোটি টাকার নিম্নমানের পুলিশি পোশাক ও কাপড় সরবরাহ সংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের গোপন সমঝোতা ছিল। বিষয়টি নিয়ে দুদক নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
লজিস্টিকসের আড়ালে ক্ষমতার বলয়: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বেনজীর আহমেদ পুলিশ প্রধান থাকাকালে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া। পুলিশের ক্রয়, টেন্ডার ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এই শাখার হাতে।
অভিযোগ রয়েছে, বেনজীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আতাউল কিবরিয়া বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে এমন একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতেন, যা বেনজীরের আর্থিক সাম্রাজ্য বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ফলে লজিস্টিক খাতে সংঘটিত সম্ভাব্য অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা গভীরভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। অনেকের মতে, বেনজীর সিন্ডিকেটের শিকড় উন্মোচন করতে হলে শুধু মূল অভিযুক্তকে নয়, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে।
ত্রিশালে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ: বেনজীর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু উচ্চপর্যায়ের আর্থিক অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়। ময়মনসিংহের ত্রিশালে স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, বেনজীরের প্রকল্পের জন্য কোটি টাকার মাছের পোনা সরবরাহ করেও তারা আজ পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ পাননি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রোকন উদ্দিনের দাবি, ত্রিশাল থানার তৎকালীন ওসি আজিজুল ইসলামের অনুরোধ ও চাপের মুখে তিনি প্রায় ৩৩ লাখ টাকার পোনা মাছ সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই অর্থ আর ফেরত পাননি।ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তাদের পাওনা অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ছায়া: উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের নানা অভিযোগ উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন জনমনে আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক দুর্নীতি তদন্তে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
তবে জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা গেলেও, তার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কি পার পেয়ে যাবেন?
ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য—যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে—তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মেগা দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র উন্মোচন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে শুধু মূল হোতাকে নয়, পুরো সহযোগী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
আপনার মতামত লিখুন :