বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল এবার প্রস্তুত হচ্ছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলার জন্য। আগামী ১৯ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা বাগান মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে পর্যটন সংশ্লিষ্ট মহল, স্থানীয় জনগণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। উৎসবটির মূল লক্ষ্য কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; বরং দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য, পোশাক, শিল্পকর্ম, লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা। আয়োজকদের ভাষ্যমতে, দেশের ২৮টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এ উৎসবে অংশ নেবে। তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য, হস্তশিল্প, খাদ্যসামগ্রী ও সংস্কৃতিকে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করবে। ফলে এটি একদিকে যেমন হবে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্র, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও সৃষ্টি করবে নতুন সম্ভাবনা।
হারমোনি ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করবেন প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম, এমপি। এছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পর্যটন খাত এবং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আয়োজকরা মনে করছেন, সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এই অংশগ্রহণ উৎসবটির গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
হারমোনি ফেস্টিভ্যালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সরাসরি প্রদর্শন। খাসিয়া, মনিপুরি, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, রাখাইন, মুণ্ডা, ওরাও, হাজং, কুকি, লুসাইসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নৃত্য, গান, লোককাহিনি, ধর্মীয় আচার, বাদ্যযন্ত্র এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপিত হবে। পাশাপাশি থাকবে তাদের নিজস্ব রান্না, কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ ও হস্তশিল্পের প্রদর্শনী এবং বিক্রয় কার্যক্রম। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভের সুযোগ পাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এখন ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ বা সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন। শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাওর ও ছোট ছোট টিলা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হলেও হারমোনি ফেস্টিভ্যালের মতো আয়োজন পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ করছে। এর মাধ্যমে পর্যটকরা শুধু প্রকৃতি নয়, এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানার সুযোগ পাবেন।
রাধানগর ট্যুরিজম এন্ট্রাপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তারেকুর রহমান পাপ্পু বলেন, “হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি শ্রীমঙ্গলের পর্যটন অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তিন দিনের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হারমোনি ফেস্টিভ্যালকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এমনভাবে ব্র্যান্ডিং করা, যাতে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বার্ষিক ইভেন্টে পরিণত হয়। প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে শ্রীমঙ্গলের হোটেল-রিসোর্টগুলো পর্যটকদের পদচারণায় পরিপূর্ণ থাকে—এমন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করা প্রয়োজন। সঠিক প্রচার ও পরিকল্পনার মাধ্যমে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ এবং টেকসই পর্যটন বিকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।”
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মনে করেন, এ ধরনের উৎসব তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বায়নের এই সময়ে অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা, গান, নৃত্য ও লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচিত করার পাশাপাশি জাতীয় মূলধারার মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হারমোনি ফেস্টিভ্যালকে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক পর্যটন উৎসবে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা আশা করছেন, প্রতিবছর নিয়মিত এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হলে শ্রীমঙ্গল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
চা বাগানের সবুজ প্রান্তর, পাহাড়ি জনপদের সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্যের বর্ণিল উপস্থাপন এবং সম্প্রীতির বার্তা—সব মিলিয়ে ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’ হতে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন খাতের জন্য এক নতুন মাইলফলক। স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :