নেত্রকোণায় বালু লুটের মহোৎসব: প্রশাসনকে ম্যানেজের অভিযোগ, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

নিজস্ব সংবাদদাতা , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

ফাইল ফটো

আসাদুজ্জামান তালুকদার নেত্রকোণা : নেত্রকোণা জেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়ে যেন বালু লুটের মহোৎসব চলছে। প্রশাসনের মাঝে মাঝে অভিযান, জরিমানা ও কারাদণ্ডের খবর প্রকাশ পেলেও বাস্তবে থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দিন-রাত চলতে থাকা এই বালু বাণিজ্যের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন এবং পরিবেশ বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরী, আটপাড়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহাদেও, সোমেশ্বরী, কংস, ধনু ও বাখলা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে গভীর রাতে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের অভিযান শুরু হলে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবার পুরোদমে শুরু হয় বালু উত্তোলন। আবার স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বালু লুট করা হচ্ছে। স্থানীয় ভূমি অফিস, উপজেলা অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে বছরব্যাপী এ অবৈধ বাণিজ্য চলে বলেও জানান তারা।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিনে অনুসন্ধান করে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সকাল ১১টায় বারহাট্টা উপজেলার তেঘরিয়া বাজার সংলগ্ন ঘাটে কলমাকান্দার মহাদেও নদ থেকে নৌকা করে বালু এনে ড্রাম ট্রাকে লোড করতে দেখা যায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বারহাট্টা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে তথ্য-প্রমাণসহ জানালে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন বলে জানান। পরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এসব বালু কলমাকান্দার মহাদেও নদ থেকে আনা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা খুঁজতে কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, খোদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ঘাটেই দাঁড়িয়ে আছে অবৈধ বালুভর্তি কয়েকটি নৌকা।

আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সরেজমিনে দেখা যায়, ভূমি অফিসের সামনেই অর্ধশতাধিক নৌকা বালু পরিবহন করে নিয়ে যাচ্ছে। উপস্থিত জনসাধারণের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান যে, দিনের বেলা একশো নৌকা গেলে রাতে পাঁচশো নৌকা দিয়ে বালু লুট হচ্ছে। রংছাতি ইউনিয়নের বরুয়াকোনা থেকে ডাইয়ার বাজার পর্যন্ত অন্তত ১০টি স্পটে ড্রেজার দিয়ে মহাদেও নদ থেকে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন। পরে সেগুলো নৌপথে বারহাট্টা পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় ড্রাম ট্রাকে লোড করে পরিবহন করা হয়। এই বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কলমাকান্দা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলামকে দুপুর ২টা নাগাদ জানালে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানান।

পরে দুপুর ৩টা নাগাদ রংছাতি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে জানা যায় যে, তাদের চোখের সামনে দিয়ে বালু লুট হলেও তারা কিছুই করতে পারছেন না। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও এর কোনো সুরাহা তারা করতে পারছেন না বলে জানান। ইউএনওকে দিনেদুপুরে শত শত নৌকা করে বালু লুটের বিষয়ে জানানো হয়েছে এবং তিনি তাদের কাছে নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রংছাতি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তাদেরকে ইউএনও কিছুই জানাননি।

পরে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বারহাট্টার তেঘরিয়া বাজারে এসে দেখা যায় তখনও নৌকা থেকে বালু ড্রাম ট্রাকে লোড করা হচ্ছে। এর ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরেই বারহাট্টার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা আক্তার তার সরকারি গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

পরবর্তীতে বারহাট্টা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান যে, নায়েবকে সেখানে পাঠিয়েছিলাম। আসলে বালুগুলো আমার উপজেলা থেকে তোলা হয়নি। কিন্তু কলমাকান্দা থেকে আপনার উপজেলা হয়ে অবৈধভাবে বালু লুট হচ্ছে। আপনার উপজেলাতেই নৌকা থেকে ড্রাম ট্রাকে লোড করা হচ্ছে। আপনি সকালে বললেন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছেন, এখন বলছেন আপনার উপজেলার বালু না কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য আছে আপনার নায়েবের মাধ্যমে আপনি বিষয়টি গাড়িতে বসে খোঁজ নিয়েছেন। আর নায়েবের মাধ্যমে গাড়ি প্রতি ২ হাজার টাকা আপনার অফিসে পাঠানো হয় এমন অভিযোগও রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, আসলে আমার এসিল্যান্ড আজকে না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছি না। অন্য আরেকদিন ব্যবস্থা নিব।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর তীর ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার ফলে অনেক এলাকায় ভাঙন তীব্র হচ্ছে। কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়ক। খালিয়াজুরীর ধনু নদী এলাকায় ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রামের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কথা বললে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। তাদের দাবি, স্থানীয়ভাবে সবাই জানলেও রহস্যজনক কারণে এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলছে।

অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ট্রাক, নৌকা ও ড্রেজার জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। তবুও প্রশ্ন উঠেছে—যদি অভিযান চলমান থাকে, তবে অবৈধ বালু উত্তোলন কেন বন্ধ হচ্ছে না?

পরিবেশবিদরা বলছেন, অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় নেত্রকোণার নদ-নদী ও পরিবেশ রক্ষার সব উদ্যোগই ব্যর্থ হবে। এ বিষয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—নদী কেটে, পরিবেশ ধ্বংস করে এবং জনগণের সম্পদ লুটে নেওয়ার এই মহোৎসব কি চলতেই থাকবে, নাকি এবার সত্যিই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

Advertisement

Link copied!