তমা-তুঙ্গার বুকে মেঘের আলিঙ্গন: বান্দরবান, যেখানে প্রকৃতি নিজেই কবি : ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ১২:০২ পিএম

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান: পৃথিবীর কিছু স্থান আছে, যেখানে পৌঁছালে মনে হয় মানুষ আর প্রকৃতির মাঝখানে কোনো দূরত্ব নেই। সেখানে ভাষা হারিয়ে যায়, যুক্তি থেমে যায়, কেবল অনুভূতি কথা বলে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পাহাড়ের রাজ্য বান্দরবান, তারও গভীরে থানচি, আর থানচির বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তমা-তুঙ্গা ঠিক তেমনই এক বিস্ময়ের নাম। যে দৃশ্য একদিন নীরবে এসে হৃদয়ের গভীরে অনন্তের প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিল, আজ তারই মহাকাব্য শোনাব। এটি কেবল কোনো ভ্রমণের গল্প নয়; এটি পাহাড়ের সঙ্গে মেঘের প্রেম, ঝরনার সঙ্গে বাতাসের গোপন আলাপন, আর মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির চিরন্তন আত্মীয়তার এক মুগ্ধকর উপাখ্যান।

রবীন্দ্রনাথ যদি এই পথে হাঁটতেন, হয়তো বলতেন-"আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ"-এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে তমা-তুঙ্গার চূড়ায় একবার দাঁড়াতে হয়। আর নজরুল হয়তো বিদ্রোহ ভুলে মেঘের কাছে প্রেমের গান লিখতেন। জীবনানন্দ দাশ হয়তো তাঁর রূপসী বাংলার নতুন একটি অধ্যায় সংযোজন করতেন এই পাহাড়ের নাম দিয়ে। শহরের জীবন মানুষকে ব্যস্ত করে, কিন্তু প্রকৃতি মানুষকে সম্পূর্ণ করে। কংক্রিটের দেয়াল, যান্ত্রিক শব্দ আর অবিরাম প্রতিযোগিতার ভিড়ে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে। তখন কোনো এক অদৃশ্য আহ্বান তাকে ডেকে বলে- "ফিরে এসো, প্রকৃতির কাছে ফিরে এসো।"

সেই আহ্বানেই একদিন আমি রওনা হয়েছিলাম বান্দরবানের পথে।

বান্দরবান শহর পেরিয়ে যখন গাড়ি থানচির দিকে এগোতে লাগল, মনে হলো যেন পৃথিবীর এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে প্রবেশ করছি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি, কোথাও কুয়াশার চাদর, কোথাও মেঘের ছায়া-সব মিলিয়ে পথটুকুই যেন গন্তব্যের চেয়ে সুন্দর।

জীবনানন্দ লিখেছিলেন- "বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।"

থানচির পথে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো এই পাহাড়গুলোও দেখেছিলেন তাঁর কল্পনার চোখে। কারণ এখানে প্রকৃতি শুধু দৃশ্য নয়, একটি গভীর অনুভূতির নাম। পাহাড়গুলোকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, তারা নীরব সাধক। শত শত বছর ধরে তারা আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড় এসেছে, বৃষ্টি এসেছে, ঋতু বদলেছে, সভ্যতা বদলেছে; কিন্তু পাহাড়ের ধ্যান ভাঙেনি। তাদের এই নীরবতা শব্দের চেয়ে শক্তিশালী।

পথের পাশে সাঙ্গু নদী কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য। কোথাও রপালি ফিতের মতো, কোথাও গভীর সবুজ জলের আয়না। পাহাড়ের বুক চিরে তার বয়ে চলা দেখে মনে হয়, কোনো মহাশিল্পী বিশাল ক্যানভাসে তুলির টানে এঁকে দিয়েছেন এক অনন্ত রেখাচিত্র। প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার বিনয়। সে কখনো নিজের সৌন্দর্যের বিজ্ঞাপন দেয় না। তবু মানুষ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তার কাছে আসে। থানচির পাহাড়ও তেমনই। তারা নিঃশব্দ, অথচ মহিমান্বিত।

তারপর এল সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত-তমা-তুঙ্গা।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতি জন্ম নেয়, তা বিস্ময় নয়-নীরবতা। কারণ সৌন্দর্যেরও এমন একটি স্তর আছে, যেখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

চারদিকে যতদূর চোখ যায়, পাহাড় আর পাহাড়। স্তরের পর স্তর সবুজ ঢেউ যেন জমে গিয়ে পাহাড় হয়েছে। তাদের মাথায় ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের দল। কখনো মনে হয় মেঘ পাহাড়কে আলিঙ্গন করছে, কখনো মনে হয় পাহাড়গুলো মেঘের সমুদ্রে ভেসে আছে।

রবীন্দ্রনাথের "বলাকা"-র উড়ন্ত মেঘ যেন এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আর নজরুলের "দুর্গম গিরি কান্তার মরু"র অভিযাত্রা যেন এই পাহাড়ের পথেই শেষ হয়েছে। বাতাস এখানে অন্যরকম। শহরের বাতাসে ধোঁয়া থাকে, এখানে থাকে স্বাধীনতা। শহরের বাতাসে ক্লান্তি থাকে, এখানে থাকে পুনর্জন্মের অনুভূতি। সেই বাতাস যখন মুখ ছুঁয়ে যায়, মনে হয় বহুদিনের জমে থাকা অবসাদ ধীরে ধীরে ঝরে যাচ্ছে।

তমা-তুঙ্গার চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত অহংকার আসলে কত ক্ষুদ্র।

মানুষ আজ আকাশে উড়ে, সমুদ্রের তলদেশে যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করে। কিন্তু একটি পাহাড় সৃষ্টি করতে পারে না। একটি মেঘের প্রাণ দিতে পারে না। একটি নদীকে জীবন্ত করে তুলতে পারে না। প্রকৃতির সামনে দাঁড়ালে মানুষ তার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে। আর সেই উপলব্ধিই তাকে বিনয়ী করে তোলে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মানুষকে ভ্রমণ করতে এবং তাঁর সৃষ্টিকে পর্যবেক্ষণ করতে বলেছেন। কারণ প্রকৃতি হলো এক উন্মুক্ত গ্রন্থ। পাহাড় তার অধ্যায়, নদী তার বাক্য, মেঘ তার অলংকার, আর বাতাস তার অদৃশ্য ভাষা। তমা-তুঙ্গার চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন সেই গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা পড়ছি।

নিচে পাহাড়ি জনপদ। বাঁশ ও কাঠের ছোট ছোট ঘর। তাদের জীবন কঠিন, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর। তারা জানে বৃষ্টি কখন আসবে, কোন মেঘ কী বার্তা বহন করে, কোন বাতাস কী গল্প বলে। প্রকৃতির সঙ্গে এমন সহাবস্থান শহুরে মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। গোধূলির সময় যখন সূর্যের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে, তখন পুরো দৃশ্যপট সোনালি হয়ে ওঠে। মনে হয় পৃথিবীর কোনো প্রাচীন মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় পড়ছি। দূরের পাহাড়গুলো ক্রমে নীল হয়ে আসে, মেঘগুলো গোলাপি আভা ধারণ করে, আর আকাশ ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগোয়। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, প্রকৃতি আসলে এক মহান কবি। সে প্রতিদিন নতুন কবিতা লেখে, কিন্তু কোনো বইয়ে ছাপায় না। যারা পাহাড়ে আসে, তারাই কেবল সেই কবিতা পড়তে পারে।

ফেরার সময় তমা-তুঙ্গা ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছু সৌন্দর্য চোখে নয়, হৃদয়ে থেকে যায়। এই পাহাড়, এই মেঘ, এই বাতাস, এই নীরবতা-সবকিছু যেন আমার ভেতরে স্থায়ী ঠিকানা করে নিল। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি, মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছে তমা-তুঙ্গা। পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসছে সন্ধ্যার আলো। বাতাসে ভেসে আসছে অরণ্যের গন্ধ। আর প্রকৃতি তার চিরন্তন কণ্ঠে বলে চলেছে-

"মানুষ, তুমি যত দূরেই যাও না কেন, তোমার আত্মার ঠিকানা প্রকৃতির মাঝেই।"

আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম, আর প্রকৃতি যেন নীরবে বলছিল- "মানুষ, তোমার সকল অহংকার ক্ষণস্থায়ী; চিরন্তন কেবল এই সৌন্দর্য, এই সৃষ্টি, এই অনন্ত মহিমা।" সেই মুহূর্তে আমি আর কেবল একজন ভ্রমণকারী ছিলাম না; আমি হয়ে উঠেছিলাম প্রকৃতির এক বিনম্র পাঠক, যে পাহাড়ের পাতায় পাতায়, মেঘের ভাঁজে ভাঁজে

এবং বাতাসের সুরে সুরে সৃষ্টিকর্তার মহিমান্বিত কাব্য পাঠ করছিল। এই লেখনী সেই অনুভবেরই রূপান্তর-বান্দরবানের পাহাড়, মেঘ, আকাশ ও নৈঃশব্দ্যের বুকে খুঁজে পাওয়া এক অনন্ত সৌন্দর্যের নিবেদিত স্মারক।

লেখক: জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি (অব:), বাংলাদেশ পুলিশ 

Advertisement

Link copied!