দুই মায়ার দোদুল্যমানতা জল, কাদা আর লবণের সেই সন্ধ্যায় আমি তমা-তুঙ্গা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। পেছনে পড়ে থাকে পাহাড়ের গাঢ় নীরবতা, সামনে টানে সমুদ্রের অমোঘ আহ্বান-আর আমি, এক পথিক, দুই মায়ার মাঝে দোদুল্যমান। পাঠক শোনো, একান্ত নিভৃতে ডুবে থাকা যদি কোনো আত্মার স্বগতোক্তি হয়, তবে তমা-তুঙ্গা ঠিক তা-ই-জীবনের নিরালা এক স্বগতোক্তি, যেখানে পাহাড় আর মাটি, গাছ আর মেঘ-বৃষ্টিতে ভেজা বাতাস মিলে এক অদৃশ্য মন্ত্র পড়ে চলে। বর্ষার প্রতিটি ফোঁটা যেন সেই মন্ত্রেরই পঙক্তি, ঝরাপাতার মর্মর ধধ্বনি যেন তারই আবৃত্তি। আর কক্সবাজার? কক্সবাজার যেন মহাকাব্যের সেই পূর্ণচ্ছেদ, যে-চ্ছেদে কবি আপন সত্তাকে বিসর্জন দেন সমগ্রের কাছে, 'আমি'র বিলয় ঘটে মহা-'তুমি'তে। সেখানে আর কোনো পৃথক সত্তা থাকে না-থাকে শুধু জল, আকাশ, আর অসীমের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ার পরম তৃপ্তি।
তমা-তুঙ্গার পাহাড়, তার সবুজ মাটির গন্ধ, গাছেদের চুপিচুপি কথোপকথন, মেঘের আনাগোনা আর বৃষ্টিতে ভেজা হাওয়ার কোমল স্পর্শ-এ সব কিছুই যেন আমাকে প্রস্তুত করছিল সমুদ্রের সঙ্গে চোখ-ভেজানো এক মিলনের জন্য। নিজেও জানতাম না সেদিন, তমা-তুঙ্গার প্রতিটি কোণ গোপনে আমার দু-চোখে সমুদ্রের স্বপ্ন এঁকে দিচ্ছিল-পাহাড়ের গায় লেগে থাকা কুয়াশায় দেখছিলাম ঢেউয়ের ভ্রম, বাঁশবনের ফাঁকে শুনছিলাম দূরের জোয়ারের গর্জন।
তারপর সেই ভোর-পৃথিবী তখনো চোখ রগড়াচ্ছে, আমি এসে দাঁড়িয়েছি কক্সবাজারের বালুতটে। প্রথম ঢেউ চোখে পড়তেই মনে হলো, চোখের তারায় যেন অজস্র সূর্য ডুবে গিয়ে উঠছে, যেন সৃষ্টির আদি আলো আর শেষ আলো একসঙ্গে খেলা করছে জলের বুকে। এ কী চমক! এ কী আলোর মহাযজ্ঞ! প্রতিটি ঢেউ যেন সূর্যের একটি করে টুকরো বয়ে নিয়ে আসে, আবার মুহূর্তেই লুকিয়ে ফেলে অতলে। এই সমুদ্রজল শুধু আকাশের প্রতিবিম্ব নয়-নিজেরই এক গভীর আকাশ সে বয়ে বেড়ায় বুকের ভেতর। সেখানে নিঃশ্বাসের মতো বাতাস ধীরে ধীরে মেঘ হয়ে ভাসে, আর ঢেউয়েরা তারা হয়ে ঝিকিয়ে ওঠে, চকিতে ফুটে যায় কোনো এক মহাজাগতিক ছায়াপথের নকশা। যদি মন দিয়ে দেখো, তবে বুঝবে-এই জল জানে মহাবিশ্বের আদি গোপন কিছু ইশারা, যে ইশারা আজও মানুষের ভাষায় ধরা দেয়নি।
দাঁড়িয়ে আছি বালুতটে। ঢেউ আসছে, আছড়ে পড়ছে, সরে যাচ্ছে-যেন সৃষ্টি জগতের শ্বাস-প্রশ্বাস। কখনো গভীর, দীর্ঘশ্বাসের মতো; কখনো বা শিশুর কলহাস্যের মতো চঞ্চল। আজ থেকে প্রায় শ'খনেক বছর আগে এই বালুতটে দাঁড়িয়েছিলেন এক যুবক, বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ হবে, পরনে ধুতি, চোখে অনন্তের স্বপ্ন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। বালিয়াটলির নির্জন বাংলোয় বসে তিনি শুনেছিলেন সমুদ্রের সেই চিরন্তন সংগীত-যে সংগীতের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই, শুধু এক অনন্তকাল ধরে বেজে চলার ইতিহাস আছে। লিখেছিলেন, "তবু মনে হয়, এই জলরাশির দোলায় মানুষের মন আপনার সীমা ছাড়াইয়া আপনাকে বিশ্ববিধাতার মধ্যে নিবেদন করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিতেছে।”
আমি সেই একই ঢেউ দেখছি। সময় বদলেছে, তটে উঠেছে আলোকসজ্জা, কংক্রিটের অভয়ারণ্যে ঢাকা পড়েছে নির্জনতা, কিন্তু ঢেউয়ের ছন্দ বদলায়নি। সেই ছন্দ আজও নিবেদনের, আপনাকে হারিয়ে ফেলার, ক্ষুদ্র 'আমি'কে মহা 'তুমি'তে গলিয়ে দেওয়ার।
আমি জুতো খুলে রাখলাম বালুতটে। তমা-তুঙ্গার কাদা যে পা ধুয়ে এসেছিল কক্সবাজারের প্রতীক্ষায়, সেই পায়ের তলায় এবার ভিজে বালির প্রথম স্পর্শ-শীতল, নরম, যেন পৃথিবীর করতল ছুঁয়ে গেল আমার পায়ের তলা। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। প্রথম ঢেউ এসে যখন পা ভিজিয়ে দিল, শিহরণ জাগল গোটা শরীরে। সে শুধু ঠান্ডা জলের শিহরণ নয়, যেন কোনো প্রাচীন কবিতার ধূলি-পড়া অক্ষর হঠাৎ সজীব হয়ে শরীরের চামড়ায় এসে ঠেকল, কেঁপে উঠল শিরায় শিরায়। প্রতিটি লোমকূপ যেন জেগে উঠল, চিনে নিল সেই আদি স্পর্শ, যে স্পর্শের স্মৃতি বয়ে বেড়ায় আমাদের রক্তকণিকারা।
ভাবলাম, রবীন্দ্রনাথ যদি এখানে দাঁড়িয়ে তাঁর "সাগরিকা" কাব্যের বীজ খুঁজে পেয়ে থাকেন-সেই বীজ, যা থেকে অঙ্কুরিত হয়েছিল নারীর রূপে সমুদ্রের অপরূপ বন্দনা-নজরুল যদি এ সমুদ্র দেখে বিদ্রোহের পাশাপাশি খুঁজে পান কোনো অনন্ত প্রেমের গোপন ঠিকানা-যেখানে ধ্বংস আর সৃষ্টি একাকার-তবে এ জল নিছক জল নয়। এ জল সৃষ্টিকর্তার সেই অদৃশ্য কালির দোয়াত, যে কালিতে তিনি লিখে চলেছেন মহাজাগতিক সমস্ত কিছু-তারা থেকে ফেনা, স্রোত থেকে মানবাত্মার আকুলতা, জন্ম থেকে মৃত্যুর পরপারের সব অলিখিত পঙক্তি। এই জলেই ভেসে আছে সূর্যের প্রথম কিরণ, এই জলেই প্রতিধ্বনি হয় চাঁদের মৌন আহ্বান।
মনে পড়ল নজরুলের সেই পঙক্তি, যেন সিন্ধুর বুকে ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন কবি- "ঘুমাও, ঘুমাও, ব্যথার সাগর, শিয়রে জাগিছে কে? স্বপন-কেতন উড়ায়ে যামিনী ডাকিছে তাহারে 'এসো' রে..."।কাজী নজরুল ইসলাম সমুদ্রকে দেখেছিলেন ডাকের মতো-গভীর এক আহ্বান, যেন দূরের কোনো অস্পষ্ট তীর থেকে কেউ ডেকে চলেছে অবিরাম; আবার দেখেছিলেন শান্তির মতো-চিরনীরব এক আশ্রয়, যেখানে সব কোলাহল থেমে যায়, সব বিদ্রোহ খুঁজে পায় পরম বিশ্রাম। তিনি যে কক্সবাজারে এসেছিলেন, ইতিহাসে তার স্পষ্ট দলিল নেই, কিন্তু তাঁর কাব্যের শরীর জুড়ে সিন্ধুর উপস্থিতি বারবার-নিয়তির মতো, জোয়ারের মতো, প্রত্যাবর্তনের মতো।
সেই সিন্ধুই আজ আমার চোখের সামনে। প্রশ্ন জাগে-এই ঢেউগুলো কি বিদ্রোহী? না, ওরা তো প্রেমিক। চিরকালীন প্রেমিক, যার প্রেমে কোনো শর্ত নেই, নেই কোনো অবসান। ওরা শুধু আসে আর ফিরে যায়, আসে আর ফিরে যায়-অন্তহীন এক প্রণয়ের ছন্দে, যেন বুকের ভেতর কেউ বলে চলে: এসো, আরও কাছে এসো, আরও গভীরে... যত গভীরে যাবে, তত আপন হবে এই নীল, তত নিঃশেষে ধুয়ে যাবে তোমার জীর্ণতা।
আমি ধীরে ধীরে জলে নামছি। প্রথমে হাঁটুজল, তারপর কোমরজল-প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন অন্য কোনো সত্তায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ঠান্ডা আর লাগে না, বরং এক আশ্চর্য আপন অনুভূতি জড়িয়ে ধরে আমাকে। শরীর যেন আর আমার নেই, সে বিলীন হয়ে উঠছে সমুদ্রেরই অংশে। যেন প্রতিটি কোষ খুলে খুলে মিশে যাচ্ছে এই নোনা অমৃতে। তমা-তুঙ্গায় আমি ছিলাম পাহাড়ের গাঢ় মাটির নরম পলি, শিকড়ের কাছাকাছি, ধীরস্থির, সংহত; এখানে কক্সবাজারের নোনাজলে আমি ধীরে ধীরে লবণ হয়ে উঠছি-সেই পলি থেকে স্বাদে রূপান্তরের এক নীরব যাত্রা। পলি যেমন নদীর বুকে জমে চর তৈরি করে, লবণ তেমনি সমুদ্রের বুকে দ্রবীভূত হয়ে তাকেই স্বাদ দেয়; আমিও যেন তেমনি দ্রবীভূত হচ্ছি, নিজের স্বাদটুকু বিলিয়ে দিচ্ছি এই অসীমকে।
একেকটা ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে যায়, মুছে দিয়ে যায় পায়ের তলার বালির চিহ্ন। যেন প্রতিটি ঢেউ কানে কানে বলে যায়, "তুই কি জানিস, তোর চোখের জলের মতোই এই জল? একই নুন? একই উৎস?” কী অদ্ভুত মিল! চোখের জল আর সমুদ্রের জল-এরা শুধু লবণাক্ততায় এক নয়, যেন আবেগের রসায়নেও এক। দুই-ই উৎসারিত হয় সৃষ্টির সেই আদি উৎস থেকে, যেখানে ব্যথা আর প্রেম, বিষাদ আর বিশালতা একাকার হয়ে মিশে আছে। তাই বুঝি সমুদ্র দেখলে চোখ ভিজে আসে, তাই বুঝি কাঁদতে কাঁদতে সমুদ্রের কথা মনে পড়ে-কারণ দুই-ই একই উৎসের সন্তান।
এই যে জল-শুধু নান্দনিক সৌন্দর্য নয়, এ জল অর্থনীতিরও গভীর ধারক। এই নীল জলরাশিই এখন 'নীল অর্থনীতি' নামে পরিচিত। সমুদ্রশৈবাল থেকে মৎস্যসম্পদ, লবণ থেকে জোয়ার-ভাটার অক্লান্ত শক্তি, পর্যটনের রঙিন মিছিল থেকে দূরগামী জাহাজের বুকে ভেসে চলা বাণিজ্য-কক্সবাজারের এই সমুদ্র উপকূল দাঁড়িয়ে আছে এক বিপুল সম্ভাবনার নীরব মহিমায়। প্রতিটি ঢেউ যেন বহন করে আনে শুধু ফেনা নয়, আনে জীবিকার স্বপ্ন, আনে অন্নের গন্ধ, আনে উপকূলের মানুষের প্রার্থনা।
কিন্তু আমি যখন নোনাজলে স্নান করছি, শরীর মজিয়ে দিচ্ছি এই অসীমের বুকে, তখন এই অর্থনীতিকে ফসলের হিসেবি খাতা হিসেবে দেখতে ইচ্ছে করে না। বরং দেখি প্রকৃতির এক উদার ডালা-দু-হাত ভরে দেওয়া এক দান, যে দানের কোনো মূল্য নেই, শুধু প্রাচুর্য আছে। কুয়াশাচ্ছন্ন দূর সমুদ্রে যে মাছ ধরার নৌকাগুলো ভাসছে, তাদের ছেঁড়া পালে লাগা বাতাসে কত পরিবারের ভাত ফুটছে চুলোয়। বালুতটে ঝিনুক কুড়ানো মেয়েটির হাতের মুঠোয় রোজ জমা হচ্ছে কত না-বলা স্বপ্নের ভোর। এই সমুদ্র কাউকে ফেরায় না-যেমন ফেরায় না সৃষ্টিকর্তাও। তিনি তো দিতেই থাকেন, অজস্র, অনর্গল; আমরা কেবল নিই, নীরবে, অকৃতজ্ঞের মতো-কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলে যাই বারবার। অথচ এই সমুদ্র প্রতিদিন আমাদের ক্ষমা করে যায়, প্রতিদিন নতুন করে ডেকে নেয় বুকের কাছে।
আমি জলে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীর ভাসছে-হালকা, পালকের মতো; কান ডুবে আছে জলের নিচে। দুনিয়ার সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেল, যেন কেউ এক গভীর নৈঃশব্দ্যের চাদর টেনে দিয়েছে চারপাশে। কেবল শুনি এক গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ-থির, লয়ে-চলা ছন্দ-যেন এই জল নিচের পৃথিবীটা নিজের বুকের ভেতর শ্বাস নিচ্ছে; যেন শুনতে পাচ্ছি এই গ্রহের হৃদস্পন্দন। ধূপ-ধুপ করে চলেছে পৃথিবীর আদিম হৃদয়, আর সেই তালে তালে দুলছে আমার ভাসমান দেহ।
চোখ মেলে তাকাই। উপরে অসীম আকাশ-নীল থেকে ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসা এক উদার শূন্যতা। সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন দূর সমুদ্রের বুকে পাল তোলা জাহাজ-নিঃশব্দে ভেসে চলেছে কোনো অচেনা বন্দরের দিকে, যে বন্দরের ঠিকানা জানে না কেউ। তখন এক অদ্ভুত নান্দনিক প্রতিচ্ছবি তৈরি হয় চোখের ভেতরে: উপরে আকাশ, নিচে জল, আর আমি-শূন্যে ঝুলে থাকা এক বিন্দু মাত্র। এই যে 'মাঝে আমি', এ কোন নতুন অনুভূতি! এ কোন অচেনা প্রদেশ, যেখানে পৌঁছে শরীর আর আত্মার সীমানা মুছে যায়! যেখানে 'আমি' আর 'জগৎ' আলাদা কোনো সত্য নয়, একই সত্যের দুই পিঠ মাত্র!
একটা ঢেউ এলো বড়। টের পেলাম তার লবণ-গন্ধ, যেন হাজার বছরের পুরোনো ঘামের মতো-পৃথিবীর ক্লান্তির নির্যাস, সময়ের ঘনীভূত স্বাদ। এই লবণের ইতিহাস কত বিশাল! এই যে জলরাশি, এর প্রতিটি বিন্দুতে মিশে আছে পৃথিবীর জন্মকথা। এই জলে একদিন সৃষ্টি হয়েছিল প্রথম প্রাণ-সেই আদি এককোষী জীব, যার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে এই বিপুল জীবজগৎ-আর আজ আমি সেই একই জলে স্নান করছি। আমার এ স্নান কি শুধুই শারীরিক পরিচ্ছন্নতা? একদম নয়। এ যেন এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যে অনুষ্ঠানের পুরোহিত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা, মন্ত্র ঢেউয়ের গর্জন, আর উপাচার এই নীল অমৃত জল।
আমি যেন সেই আদি প্রাণের উত্তরসূরি, ফিরে এসেছি জন্মস্থানে, ফিরে এসেছি মায়ের কোলে।অনেকে বলে, কক্সবাজার এখন কোলাহলপূর্ণ, পর্যটকদের ভিড়ে তার রূপ মলিন। আমি বলি, আড়াল সরিয়ে দেখতে পারলে এখনো তার প্রকৃত রূপ অনন্ত। বিকেলবেলায় সূর্য যখন ডুবতে থাকে, তখনো সমুদ্র তার বিখ্যাত সোনালি আয়না বিছিয়ে দেয়-আলোর ঝিকিমিকিতে জেগে ওঠে যেন এক তারল্য-স্বর্গ। কিশোর-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব-সবাই সেই জ্যোৎস্নার পথে হাঁটে, সবার পায়ের তলায় ভাঙে একই রুপালি ফেনা। সে এক মহাজাগতিক সাম্যের ছবি। সমুদ্র কারও একার নয়। এই উদারতা, এই 'সবার জন্য খোলা থাকা', এটা কি কোনো সাধারণ গুণ?
আমি ভাসতে ভাসতে ভাবছিলাম, তমা-তুঙ্গা থেকে কক্সবাজার-এ শুধু জায়গার দূরত্ব নয়, এ যেন আত্মার বিবর্তনের পথ। তমা-তুঙ্গা শিখিয়েছে নীরবতা, একাকিত্ব আর ধৈর্য-নিজের ভেতরে ডুব দেওয়ার পাঠ। আর কক্সবাজার শেখাচ্ছে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেওয়ার এক আনন্দ-সেই ডুব দেওয়া 'নিজ'কেই মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার পরমানন্দ। যারা সমুদ্রপ্রেমিক কবি, তাঁরা নিশ্চয়ই এ শিক্ষা পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সমুদ্রের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন 'মুক্তি'র ধারণা, যেখানে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ অহংকার ভুলে বিশ্বাত্মার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নজরণ পেয়েছিলেন সেখানে 'নতুনের কেতন', 'জীবনের জয়গান'-সব ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও নতুন সৃষ্টির মন্ত্র।
আর আমি, একজন সাধারণ পথিক, পেয়েছি নিজেকে নিজের কাছেই নতুন করে চেনার সুযোগ। যে 'আমি'কে আমি চিনতাম না, তাকে আবিষ্কার করলাম সমুদ্রের আয়নায়।
শেষ বিকেলে সমুদ্র জল থেকে উঠলাম। শরীরে নুন লেগে সাদা হয়ে আছে, চুলে বালি-যেন সমুদ্র নিজের ছাপ রেখে গেল আমার দেহে। তবু এক অদ্ভুত পবিত্রতার অনুভূতি হচ্ছে। যেন এক মহাজাগতিক গোসল সেরে এলাম। তমা-তুঙ্গার কাদা আমার শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল-'আমি কোথা থেকে এলাম, আমার ভিত্তি কী'; আর কক্সবাজারের নোনা জল সেই শিকড়কে পরম আকাশের দিকে প্রসারিত করতে শেখাল যে,আমি কোথায় যেতে পারি, আমার বিস্তার কতদূর। রাত নামছে। সমুদ্র এখন কালো, দূরে জেলেনৌকার আলো টিমটিম করছে-যেন দূরের আকাশ থেকে খসে পড়া কিছু তারা। আকাশে তারা ফুটেছে-রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যেন "আঁধার রজনীর গভীর দেশে” কেউ জ্বালিয়ে দিয়েছে অসংখ্য প্রদীপ। উপরে তারা, নিচে নৌকার আলো-মাঝে শুধু অসীম অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারেই লুকিয়ে সব রহস্য।
আমি তাকিয়ে রইলাম এই অসীমের দিকে। তমা-তুঙ্গার সেই পাহাড়ি ঝিরি নদী, যে কি না অবিরাম সমুদ্রের দিকে ছুটেছে-পাহাড়ের বুক চিরে, বাঁকে বাঁকে গান গেয়ে-আজ যেন আমাকে বলতে পারল, "দেখলি? আমি যাঁর কাছে ছুটে আসি, তিনি এত বিশাল!” হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তার এই মহাজাগতিক অপরূপ, তাঁর এই বিশালতায়-নদী যদি তাঁর জন্য ব্যাকুল থাকে, তবে আমি কেন থাকব না! এই যে ঢেউ, এই যে নীল, এই যে উদারতা, এ শুধু কক্সবাজারের সম্পদ নয়, এ সমগ্র মানবাত্মার সম্পদ। আর নীল অর্থনীতি? সে তো এই নান্দনিকতারই এক সৎ ও বিনম্র সন্তান, যে মায়ের মতো সমুদ্রের কোল থেকে অন্ন বটিয়ে আনে মানুষের ঘরে। যে অর্থনীতি নিঃশেষ করে না, বরং পুনর্নবীকরণের চক্রে বিশ্বাসী।
ফিরতে হবে। তমা-তুঙ্গা থেকে রওনা দেওয়া এই পথিক আবার চলবে, কিন্তু সে আর আগের মতো নেই। তার চোখে এখন সমুদ্রের নীল, মনে ঢেউয়ের ছন্দ, রক্তে লবণের স্বাদ। কক্সবাজারের এই স্নান শুধু দেহ ধুইয়ে দেয়নি, ধুইয়ে দিয়েছে তার সমস্ত ক্লান্তি, সংশয় আর সীমাবদ্ধতার ধুলো। এখন যখন আমি কক্সবাজার থেকে আবার রওনা দেব অজানার উদ্দেশে, তখন যেন সেই নজরুল-রবীন্দ্রনাথের কল্পনারই উত্তরসূরি, যে কি না জানে, সমুদ্র শুধু জল নয়, এক জীবন্ত প্রার্থনা। সেই প্রার্থনা এখন আমার ঠোঁটেও-"হে মহাজাগতিক সৃষ্টিকর্তা, তোমার এই বিশালত্বে আমি বিন্দু হয়ে বেঁচে থাকতে চাই, তোমার এই নীল উদারতায় আমি নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চাই"।
তমা-তুঙ্গা আমার শুরু, কক্সবাজার আমার উপলব্ধি, আর সমুদ্র? সমুদ্র তো শেষও নয়, শেষের আভাস মাত্র-এক অনন্ত বিস্ময়, যে বিস্ময়ের কিনারা কেউ কোনোদিন পায়নি, পাবে না কোনোদিন।
(লেখক-জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)
আপনার মতামত লিখুন :