মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাক্সেস রোড নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলনের নামে সরকারের প্রায় ৪১৬ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও হরিলুট করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার হামিদারদিয়া, ঠাকুরতলা মৌজা ও বাঁকখালী নদীর মোহনা (নুনিয়ারছড়া) এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত রয়্যালটি হার উপেক্ষা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন কক্সবাজারের বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, জিওবি ও জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাক্সেস ২৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প’-এর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশের অন্যান্য চার ও আট লেন মহাসড়কের তুলনায় এই দুই লেনের সড়কের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি, যা প্রায় ৪৭৬ কোটি টাকা।
তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-ভাঙ্গা চার লেন সড়কের নির্মাণ ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ২০১ কোটি টাকা, টাঙ্গাইল-রংপুর চার লেন সড়কে ১০০ কোটি টাকা এবং ঢাকা-তামাবিল চার লেন সড়কে ১১৫ কোটি টাকা ব্যয় হলেও মাতারবাড়ী-কক্সবাজার সংযোগ সড়কে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭৬ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের ‘সিডব্লিউ-৩বি’ ও ‘সিডব্লিউ-৩সি’ প্যাকেজের কার্যাদেশপ্রাপ্ত যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘টোকিও-এমআইএল জয়েন্ট ভেঞ্চার’ (জাপানের টোকিও করপোরেশন ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড) সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় বালু উত্তোলনের জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন, প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেন পাটোয়ারী এবং কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও জেলা বালুমহাল কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও যোগসাজশে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের সিডিউল রেট অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর সর্বনিম্ন সরকারি রয়্যালটি ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারিত থাকলেও প্রথম দফায় মাত্র ৫০ পয়সা মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক বালু উত্তোলনকারী ড্রেজার জব্দ করার পর দ্বিতীয় দফায় একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই উপ-কমিটি গণপূর্ত বিভাগের নির্ধারিত রয়্যালটি হার থেকে তথাকথিত ‘ড্রেজিং কস্ট’ বাদ দিয়ে প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ২ টাকা ৩৭ পয়সা নির্ধারণ করে, যা সরকারি বিধিমালার পরিপন্থী।
এদিকে বালু উত্তোলনের ফলে এলাকায় পরিবেশগত বিপর্যয় ও নদীভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তর বালু উত্তোলনের আগে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেও জেলা প্রশাসন ও বালুমহাল কমিটি সেই মতামত উপেক্ষা করে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ ও ‘ডিমান্ড ফর জাস্টিস’ পাঠিয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।দুদকে দাখিল করা অভিযোগে আবেদনকারী বলেন, উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে রাষ্ট্রকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, অভিযোগগুলো অভিযোগকারীর দাবি ও দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে উত্থাপিত। এ বিষয়ে পরিচালক এ.কে এম আরিফ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :