ময়মনসিংহ রেঞ্জের চার জেলায় (অফিসার ইনচার্জ) ওসি পদায়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করা একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে আবারও ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রেঞ্জের ৩৬টি থানার মধ্যে প্রায় ২২টিতে এমন কর্মকর্তাদের পদায়ন দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল। স্থানীয়ভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে তাদের পূর্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো বিভিন্নভাবে হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) ও রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পুনরায় ওসি হিসেবে পদায়ন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ওসি পদায়নকে ঘিরে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি অর্থ লেনদেনে জড়িত না থাকলেও তাদের আশপাশের কিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তা পদায়নের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
একই সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালে জেলার ডিএসবিতে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তাকেও বর্তমানে থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ওসির পদায়ন ও বদলি নিয়ে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা ও কেন্দুয়া থানাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওসি জানান, “পদায়নের জন্য অর্থ ব্যয় করার পর থানায় এসে নানা চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। থানার অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এদিকে, একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে এসেছে। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ রেঞ্জে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ২২ জন ওসির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি, ওসিরা নিজেদের পছন্দের লোককে অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবেও ব্যবহার করছেন বলে একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, নেত্রকোনা জেলার এক ওসির বিরুদ্ধে গত ছয় মাসে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকা রাজধানীতে পাঠানোর অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একজন ‘ক্যাশিয়ারকে’ আটকের পর অর্থ বহনকারীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সারাদেশের বিভিন্ন থানায় কর্মকর্তাদের কার্যক্রম ও পদায়ন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে ময়মনসিংহের চার জেলায় ওসি পদায়ন ও বদলি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ আমাদের নজরে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় শেরপুর জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার একে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি এই জেলায় নতুন যোগদান করেছি। বর্তমান ওসিদের পদায়ন আমার আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার করেছিলেন।”
অন্যদিকে, নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুর রহমান-এর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :