গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ সর্বপ্রথম ভেঙেছিলেন যে আরব নেতা

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ সর্বপ্রথম ভেঙেছিলেন যে আরব নেতা

ফাইল ফটো

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে তাঁকে শুধু একজন প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই নয়, ফিলিস্তিনের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবেও স্মরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে গাজা সফরের মাধ্যমে ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ভেঙে দেওয়া প্রথম আরব নেতা হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।

২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি নির্বাচনের পর গাজা উপত্যকার ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল। দীর্ঘ ছয় বছর সেই অবরোধ বহাল থাকার পর ২০১২ সালের অক্টোবরে শেখ হামাদ তাঁর স্ত্রী শেখা মোজা বিনতে নাসের এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে গাজা সফর করেন। পশ্চিমা দেশ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে হওয়া এই সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষও তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

হামাসের বৈদেশিক দপ্তরের প্রধান খালেদ মেশাল আল জাজিরাকে বলেন, শেখ হামাদের এই সফর ছিল গাজার অবরোধ ভাঙার প্রতীকী ঘোষণা। তাঁর মতে, শেখ হামাদই প্রথম আরব ও মুসলিম নেতা, যিনি সাহসিকতার সঙ্গে গাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরব বিষয়ক বিশ্লেষক ও আল জাজিরা আরবির সাবেক সংবাদ পরিচালক আহমেদ আল শেখের ভাষ্য, ফিলিস্তিনের প্রতি শেখ হামাদের ছিল গভীর আন্তরিকতা। তাঁর মতো করে গাজা সফরের উদ্যোগ আর কোনো আরব নেতা নেননি।

ঐতিহাসিক ওই সফরে শেখ হামাদ গাজার পুনর্গঠনের জন্য কাতারের অনুদান ২৫৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। এই অর্থায়নে আবাসন, সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মিত হয়, যা হাজারো ফিলিস্তিনির জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে ফিলিস্তিনের প্রতি তাঁর সমর্থন আরও আগের। ১৯৯৯ সালে তিনি ১৯৬৭ সালের পর প্রথম উপসাগরীয় নেতা হিসেবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সফর করেন এবং তৎকালীন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন রামাল্লায় আরাফাতের সদর দপ্তর অবরুদ্ধ করলে শেখ হামাদ প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।

২০০৮ থেকে ২০০৯ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময়ও শেখ হামাদ দোহায় জরুরি আরব শীর্ষ সম্মেলনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি গাজার পুনর্গঠনের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন এবং অবরোধ এড়াতে একটি সমুদ্রপথ চালুর প্রস্তাব দেন। যদিও পর্যাপ্ত আরব সমর্থনের অভাবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

তাঁর অর্থায়নে গাজায় গড়ে ওঠা উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হামাদ সিটি, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পুনর্নির্মাণ এবং শেখ হামাদ পুনর্বাসন ও কৃত্রিম অঙ্গ হাসপাতাল। ২০১৯ সালে চালু হওয়া এই হাসপাতালটি বর্তমানে অঙ্গহানি হওয়া রোগী ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কাতারের অর্থায়নে নির্মিত অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শেখ হামাদ হাসপাতাল নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালটি উত্তর গাজার একমাত্র সিটি স্ক্যানার পরিচালনার পাশাপাশি অঙ্গচ্ছেদের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ গাজাতেও নতুন শাখা চালু করেছে।

ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল রাজনৈতিক সমর্থন, মানবিক সহায়তা এবং গাজার অবরোধের মধ্যে ঐতিহাসিক সফরের কারণে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আজও আরব বিশ্বের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী এক নেতা হিসেবে বিবেচিত হন। ফিলিস্তিনিদের কাছে তাঁর উত্তরাধিকার সাহস, সংহতি ও মানবিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে রয়েছে।

 

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Link copied!