সাবেক প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি ঢাকতে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দৌড়ঝাঁপ?

মনির হোসেন , কালিহাতী(টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

সাবেক প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি ঢাকতে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দৌড়ঝাঁপ?

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বড় বাশালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের অফিশিয়াল নথিপত্র-আর্থিক হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে না পেয়েই তাকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ওইসব অভিযোগ ও সাবেক প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর কাদেরের বিরুদ্ধে রহস্যজনক তৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাটি ঘিরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, লুৎফর রহমান ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট বড় বাশালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভায় পরিলক্ষিত হয় ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট সম্পন্ন করেননি’। এ অবস্থায় তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে সর্বসম্মতিক্রমে দুটি পৃথক অডিট কমিটি গঠন করা হয়। প্রথম কমিটিকে ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় কমিটিকে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে প্রধান শিক্ষকের অবসরের আগ পর্যন্ত সময়ের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথম অডিট কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর কাদের, যিনি ওই সময়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি অডিট শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট জমা দেয়।

অডিট কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অডিট রিপোর্টে সাবেক প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ভাউচার জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম সহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রশাসনিক কাজে স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পরিবর্তন হয়। পরবর্তীতে ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নতুন করে গঠিত অডিটের প্রস্তাব আসলেও অজ্ঞাত কারণে অডিট চলমান নেই। ফলে দুর্নীতির অভিযোগগুলো কার্যত চাপা পড়ে যায়। বিদ্যালয়ের নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, লুৎফর রহমান বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বেতন আদায় করা হয়েছে। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহারিক ফি আদায়, রেজিস্ট্রেশনে নাম সংশোধনের নামে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া এবং এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের মূল সনদ ও প্রশংসাপত্র দেওয়ার সময় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, অডিট রিপোর্টে একজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার স্পষ্ট তথ্য উঠে এলেও রহস্যজনক কারণে তা প্রকাশ করা হয়নি। বরং সবকিছু আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, কোনো শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক অবসর বা বদলিজনিত কারণে দায়িত্ব ছাড়ার আগে বিদ্যালয়ের সব হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই কীভাবে তাকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, বিদ্যালয়ের একাধিক অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, বিষয়টি জেলা শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখিত অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

অডিট কমিটির সদস্যরা জানান, পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অডিট কমিটি দেওয়া হয়েছিল। সার্বিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে কমিটির আহ্বায়ক মঞ্জুরু কাদের স্যার ও সভাপতির নিকট রিপোর্ট প্রদান করা হয়। রিপোর্টে লুৎফর রহমানের ভাউচার কেলেঙ্কারী সহ বিভিন্ন দুর্নীতি পাওয়া যায়।

সাবেক প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান জানান, বিদ্যালয়ে আমার সময় দুটি অডিট কমিটি হয়েছিল। প্রথম অডিট কমিটির সদস্যগণ অডিটে সবকিছু উল্লেখ করেছেন। সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু অডিটে যোগ বিয়োগে একটু ত্রুটি থাকায় পুনঃ অডিট চলতেছে। এখন বিদ্যালয়ের দায়িত্বে আছেন ইউএনও স্যার। আমি গত ২৬ জানুয়ারি অবসর নিয়েছি। স্কুল থেকে প্রত্যয়ন পেয়েছি। বিদ্যালয় ত্যাগ করার পূর্বে আপনি কোনো কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে যাননি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি সকল কাগজপত্রাদি বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। উপবৃত্তিধারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয় স্বীকার করে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা নাজুক থাকায় তখন কমিটি রেজুলেশন করে যারা উপবৃত্তি পায় তাদের কাছ থেকে অর্ধেক বেতন নেওয়া হয়েছে। ভাউচার দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সভাপতি মহোদয় যেগুলো বড় ভাউচার সেগুলো বড় স্বাক্ষর দিয়েছেন, আর যেগুলো ছোট ভাউচার সেগুলো ছোট স্বাক্ষর দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর কাদের বলেন, "অডিটের কোনো রিপোর্ট কিংবা বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সাবেক প্রধান শিক্ষক আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাননি।" নথিপত্র বুঝে না পেয়েও কীভাবে সাবেক প্রধান শিক্ষককে ছাড়পত্র বা প্রত্যয়ন দেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমি কোনো ছাড়পত্র দিইনি। তবে একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি।"

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ জানান, আমি দায়িত্বরত অবস্থায় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পেলে তার মূল কারণ উদঘাটনে পাঁচ সদস্যের অডিট কমিটি গঠন করে দেই। কমিটি অডিট রিপোর্ট জমা দিলে সেই অডিটে বিভিন্ন অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। জেলা শিক্ষা অফিসার রেবেকা সুলতানা বলেন, এ বিষয়ে ইতিপূর্বে কেউ আমাকে অবহিত করেননি। বিষয়টি জেনে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বড় বাশালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি শাহীন মিয়া বলেন, কোনো অডিট রিপোর্ট আমার কাছে জমা পড়েনি। সাবেক প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। উনি অবসরে যাওয়ার পর ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন। আমি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বলেছি উনার সময়ে কোনো আপত্তি আছে কিনা, কোনো সমস্যা আছে কিনা এগুলো দেখে আমাকে অবগত করবেন।

সিয়াম সরিষা
Link copied!