কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের ৬৫ নম্বর পীরপুর মাহবুবুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটি বাণিজ্যিক লেয়ার পোল্ট্রি ফার্মের দুর্গন্ধে প্রায় তিন বছর ধরে বিদ্যালয়ের পাঠদান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কার পাশাপাশি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির পাশেই প্রায় তিন বছর আগে স্থানীয় আবুল কালামের ছেলে হাতেম মিয়া 'টি এ পোল্ট্রি ফার্ম' নামে একটি বাণিজ্যিক লেয়ার খামার স্থাপন করেন। এরপর থেকেই খামার থেকে নির্গত তীব্র দুর্গন্ধে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, শ্রেণিকক্ষের জানালা-দরজা খুললেই দুর্গন্ধে পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং শিক্ষকরা স্বাভাবিকভাবে পাঠদান পরিচালনা করতে হিমশিম খান। পাশাপাশি দুর্গন্ধের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, খামারটির মালিকের স্ত্রী ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে সাহস পাননি। তাদের দাবি, এ কারণেই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও প্রাণিসম্পদ বিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বা অন্য কোনো দপ্তরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়নি। তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিয়া খানম বলেন, "আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। দুর্গন্ধের কারণে কিছুটা সমস্যা হলেও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বা উপজেলা শিক্ষা অফিসে কখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।" অভিযোগ অস্বীকার করে টি এ পোল্ট্রি ফার্মের মালিক হাতেম মিয়া বলেন, "আমার দুই সন্তান এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এবং আমার স্ত্রী এখানেই শিক্ষকতা করেন। আমি নিয়মিতই খামার পরিষ্কার করি। খামারের কারণে কোনো সমস্যা হয় না।" প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাইনি।"
খামার মালিকের স্ত্রী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শারমিন জাহান বলেন, "যেহেতু বিদ্যালয়ের পাশেই খামারটি, তাই অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। বিদ্যালয়ের চারপাশের জমিও আমাদের পরিবারের। খামারের কারণে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।" উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, "আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি এবং বিষয়টি সম্পর্কেও অবগত নই। আপনাদের মাধ্যমে অবগত হয়েছি, শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে।"
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, "আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইয়াসিন খন্দকার বলেন, "বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামার স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়। দুর্গন্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা পরিবেশগত কারণে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে পরিচালিত বাণিজ্যিক লেয়ার ফার্মের কারণে যদি শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের মতে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

আপনার মতামত লিখুন :