সীতাকুণ্ডে অনলাইন জুয়া এখন মরণফাঁদ: সর্বস্বান্ত তরুণ থেকে প্রাপ্তবয়স্ক

মো: ওমর ফারুক রকি , সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

সীতাকুণ্ডে অনলাইন জুয়া এখন মরণফাঁদ: সর্বস্বান্ত তরুণ থেকে প্রাপ্তবয়স্ক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অনলাইন জুয়া নামক সামাজিক ব্যাধি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাত-দিন বিভিন্ন অলিগলিতে জড়ো হয়ে এসব অনলাইন জুয়া চলছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এখন গ্রামের তরুণ থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক অনেকেই অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, স্থানীয় বিকাশ দোকান, হাট-বাজার কিংবা চায়ের দোকানেও মোবাইল ফোনে অনলাইন জুয়া খেলার দৃশ্য। এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে দেখা যায়, অটোরিকশা চালক নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিতে এসে ফোনে ব্যস্ত। তার মোবাইল স্ক্রিনে খোলা ছিল একটি অনলাইন জুয়ার সাইট। বোঝা যায়, তিনি টাকা রিচার্জ করে জুয়া খেলছেন। দেখতে ভিডিও গেমের মতো হলেও, সেখানে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছেন তার কষ্টার্জিত অর্থ। শুরুতে জিতিয়ে তৈরি করা হয় আসক্তি

সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন স্থানে গোপনে ও প্রকাশ্যে তরুণদের মধ্যে এই আসক্তি বাড়ছে, যা তাদের ঋণগ্রস্ত ও অপরাধমুখী করে তুলছে। কষ্টার্জিত অর্থ সম্পদ অবলীলায় জুয়ার কোটে বিলিয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার জন্য শয়তানের পেতে রাখা এক ফাঁদ এটি। এতে আসক্তি একজন ব্যক্তির মানসিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সার্বিকভাবে চিন্তা করতে গেলে এর ভয়াবহতা একটি দেশের জন্য মারাত্মক ডেকে আনবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লোভের বশবর্তী হয়ে অনেক যুবক এই জুয়ার জগতে পা রেখেছেন। কেউ কেউ ভাগ্যের জোরে কিছু টাকা জিতে হঠাৎ ধনী হয়ে পড়ছেন, আবার অনেকেই সব হারিয়ে পথে বসছেন। এলাকায় এমন অনেকের দেখা মেলে যারা কোনো দৃশ্যমান কাজ না করেও হঠাৎ বাড়ি, গাড়ির মালিক হয়েছেন। ফলে অনেক তরুণ তাদের অনুকরণ করে লোভে পড়ে সব হারিয়ে ফেলছেন।

ভাটিয়ারির সিএনজি চালক আবুল কাসেম বলেন, “আগে আমার দুটি সিএনজি ছিল। এক পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ি। প্রথমে কিছু টাকা জিতেছিলাম, পরে হারতে হারতে সব শেষ। এখন আমি একেবারে নিঃস্ব।”

টবাকো গেটের পোর্টলিং ডিপোর এক দিনমজুর জামাল বলেন, “প্রতিদিন কাজ করে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা আয় করতাম, যা দিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলতো। একদিন এক বন্ধুকে দেখি ৩০-৪৫ মিনিটে ১০০ টাকার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা জিতলো। এটা দেখে লোভে পড়ে আমিও জুয়া খেলতে শুরু করি। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি পালিয়ে বেড়াই।” এজেন্ট চক্রই বিস্তারের মূল শক্তি

স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জুয়া খেলার পেছনে কাজ করছে একাধিক স্থানীয় এজেন্ট। তারা মূলত অনলাইন জুয়া সাইটের প্রতিনিধিত্ব করে। একজন খেলোয়াড় যত বেশি টাকা হারান, তার নির্দিষ্ট একটি শতাংশ সরাসরি ওই এজেন্টের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। ফলে দিন দিন এজেন্টের সংখ্যা বাড়ছে এবং তারাই এই জুয়ার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন গ্রামে।

স্থানীয় এক শিক্ষক বলছেন, বর্তমানে ডিজিটালাইজেশনের যুগে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে দেশের মানুষ। স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইনে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে বাজি ধরা হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে এই ভালো কাজের ব্যবহারের মতো মন্দ কাজ তথা খারাপ কাজেও ব্যবহার করছে এক শ্রেণির অপরাধী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন অনলাইন জুয়ার প্রচলন শুরু হয়েছে। ফলে ডিজিটালে যেমন সুবিধা ভোগ করছে তেমন অপরাধের ঘটনাও ঘটছে। ক্যাসিনো, সাধারণ জুয়া খেলার চেয়েও এই অনলাইন জুয়ার বাজি আরও বেশি ভয়ঙ্কর। প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেখানে সেখানে থেকে এই জুয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার, লাখ লাখ ডলার লেনদেন হচ্ছে। এতে অপরাধীরা ছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে জুয়ার নেশা ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকে জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন বাজির মরণ খেলায়। জুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেকে। কেউ আবার বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, “সীতাকুণ্ডে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিআইডি ও স্থানীয় পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জুয়া চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে টেলিকম ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে এসব অবৈধ অ্যাপ ও লেনদেন বন্ধ করা যায়।

সিয়াম সরিষা
Link copied!