চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে সবজির উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর সবুজ সবজি ক্ষেত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়ায় এখানকার বিভিন্ন হাট-বাজারের সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে উত্তরবঙ্গের সবজির মাধ্যমে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৯২০ হেক্টর সবজি ক্ষেতের মধ্যে ৭৬১ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৬ হাজার ৮০০ জন সবজি চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারমধ্যে বাজালিয়া, পুরানগড়, ছদাহা, সোনাকানিয়া, আমিলাইশ, কাঞ্চনা, কালিয়াইশ ও চরতি ইউনিয়নের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানকার অধিকাংশ সবজি ক্ষেতে বন্যার পানি জমে থাকায় শিকড় পঁচে গাছ মরে গেছে।
সরেজমিনে উপজেলার কেরানীহাট কাঁচাবাজার, বোমাংহাট বাজার, সাতকানিয়া পৌর বাজার ও দস্তিদারহাট বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির দোকানগুলোতে স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত সবজির পরিবর্তে যশোর, রাজশাহী, জামালপুর, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর ও জয়পুরহাট থেকে আনা সবজিই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও কুমিল্লা থেকে আনা সবজিও বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ বাজারগুলোতে কাঁচামরিচসহ সকল ধরনের সবজির সরবরাহ থাকলেও অধিকাংশই উত্তরবঙ্গ থেকে আসছে।
কেরানীহাট বাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে আগের মতো সবজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রাকযোগে আসা সবজি পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয় করে ভোক্তাদের নিকট বিক্রি করছি। এছাড়াও দূরপাল্লার পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচ ও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বাজারে সবজির দামও কিছুটা বেড়েছে।
ঢেমশা ইউনিয়নের সবজি চাষি রফিক বলেন, বন্যার পানি বেশ কয়েকদিন জমে থাকায় অধিকাংশ সবজি গাছ পঁচে গেছে। যেসব জমিতে ফলন আসার কথা ছিল, সেগুলোও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এখন নতুন করে জমি প্রস্তুত, বীজ সংগ্রহ ও চাষাবাদ শুরু করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের মাদারবাড়ি এলাকা থেকে কেরানীহাট কাঁচাবাজারে সবজি ক্রয় করতে আসা কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিন বলেন, আমাদের বাড়ির আশেপাশে প্রচুর পরিমাণে সবজি চাষ হলেও বন্যার ফলে সব নষ্ট হয়ে গেছে। আর বাজারে সবজির সংকট না থাকলেও দাম আগের তুলনায় বেশি। মূলত স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাইরের জেলার সবজির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন ইউনিয়নে উৎপাদিত সবজি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করে ট্রাকযোগে কুমিল্লার নিমসার বাজার ও কক্সবাজারের চকরিয়া ও উখিয়াসহ বিভিন্ন আড়তে বিক্রয়ের জন্য পাঠান স্থানীয় পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্যার আগে আমরা প্রতিদিন এখানে উৎপাদিত কয়েক ট্রাক সবজি কুমিল্লার নিমসার বাজারে বিক্রির জন্য পাঠাতাম। কিন্তু এখন ব্যবসা প্রায় বন্ধের পথে। তাই বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী বান্দরবান জেলা থেকে সংগ্রহ করা সবজি বিভিন্ন জেলার আড়তে পাঠাতে হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বন্যায় উপজেলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই স্থানীয় উৎপাদনে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু সবজিক্ষেত এখনো টিকে আছে। বর্তমানে সেগুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও কুমিল্লার সবজি এখানকার চাহিদা মেটাচ্ছে। পুনরায় আবাদ শুরু হলে বাজারে স্থানীয় সবজির সরবরাহ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার কৃষককে ৫ কেজি করে উচ্চ ফলনশীল জাতের রোপা আমন ধানের বীজ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। যারা সবজি চাষের পাশাপাশি ধান চাষ করে থাকেন তাদেরকেও এ প্রণোদনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :