বাবা আর কোনো দিন ফিরবেন না—ছয় বছরের তৌকির এখন এই কঠিন সত্যটি বুঝতে শিখেছে। কিন্তু বাবাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার হবে কি না, সেই উত্তর এখনো তার অজানা। আর সেই অজানা প্রশ্ন নিয়েই শুক্রবার বাবার হত্যার এক বছর পূর্তিতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় বাবার ছবিসংবলিত ব্যানারের সামনে বসেছিল ছিল ছোট্ট তৌকির।
চারপাশে তখন প্রতিবাদ, স্লোগান আর বিচারের দাবি--সাংবাদিকদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি। কিন্তু সব শব্দকে ছাপিয়ে যায় বাবাহারা শিশুটির নীরব উপস্থিতি। ব্যানারে বাবার ছবি, সামনে দাঁড়িয়ে ছয় বছরের সন্তান,দৃশ্যটি যেন একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার প্রশ্নকে আরও গভীর করে তোলে।
গত বছরের ৭ আগস্ট গাজীপুরের ব্যস্ত চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিনকে।
জনবহুল এলাকায় সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। এক বছর পর একই স্থানে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তুহিনের সন্তান তৌকির।
যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা স্কুল, খেলনা, বন্ধু আর বাবার স্নেহকে ঘিরে, সেই বয়সেই তৌকিরের জীবনে ঢুকে পড়েছে ‘হত্যা’, ‘মামলা’, ‘আদালত’ আর ‘বিচার’-এর মতো কঠিন শব্দ। আইনের ধারা কিংবা আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া বোঝার বয়স তার হয়নি। সে শুধু জানে,তার বাবা আর বাড়ি ফিরবেন না।
এক হত্যাকাণ্ডে বদলে গেছে তৌকিরের শৈশব-তুহিন হত্যাকাণ্ড অন্যদের কাছে একটি আলোচিত অপরাধ। কিন্তু তৌকিরের কাছে এটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার নাম। বাবার হাত ধরে হাঁটা, ঈদের দিনে বাবার সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া কিংবা বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবী দেখা, এসব স্মৃতি এখন তার জীবনে কেবলই অতীত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাবাকে হারানোর পর ছোট্ট তৌকির ধীরে ধীরে বাস্তবতাটি বুঝতে পারছে। তাই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, তুহিন হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক ও আদালতে দোষী প্রমাণিত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
এগোচ্ছে সাক্ষ্যগ্রহণ, অপেক্ষায় পরিবার--তুহিন হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে এগিয়েছে। মামলার বাদী ও নিহত তুহিনের বড় ভাই সেলিমের প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তুহিনের ভাতিজা সোহাগসহ পুলিশ সদস্য ও আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দিও গ্রহণ করেছেন আদালত।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মামলার প্রধান অভিযুক্ত কেটু মিজান ওরফে কোপা মিজান, তার স্ত্রী গোলাপিসহ আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
তুহিনের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের দাবি, মামলাটি যেন দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আবেদনও করা হয়েছে।
তবে আদালতের প্রতিটি ধাপ, সাক্ষ্যগ্রহণ কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার হিসাব ছোট্ট তৌকিরের জানার কথা নয়। তার কাছে অপেক্ষার অর্থ একটাই—বাবার হত্যার বিচার।
স্লোগানের ভিড়ে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠল শিশুটির নীরবতা--শুক্রবারের কর্মসূচিতে ছিল নানা স্লোগান, বক্তব্য ও প্রতিবাদ। ছিল দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি। কিন্তু কর্মসূচির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য হয়ে ওঠে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৌকির।
যে ছোট্ট হাতটি বাবার আঙুল ধরে পথ চলার কথা, সেই হাতেই আজ বাবার বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। যে শিশুর বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবী দেখার কথা ছিল, সে-ই আজ বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে।
তৌকির হয়তো জানে না ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’ কী, জানে না সাক্ষ্যগ্রহণ কত দিন চলে কিংবা একটি হত্যা মামলার রায় হতে কত সময় লাগে। সে শুধু জানে, তার বাবা আর ফিরবেন না।
এক বছর পরও তাই প্রশ্নটি রয়ে গেছে—বাবা যখন আর ফিরবেন না, তখন অন্তত তার হত্যার বিচার কি হবে?
চান্দনা চৌরাস্তার সেই নীরব শিশুটি যেন রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা ও সমাজের কাছে একটাই প্রশ্ন রেখে গেছে—“আমার বাবার হত্যার বিচার হবে তো?”

আপনার মতামত লিখুন :