গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে হামিদ মন্ডলের অস্ত্রের মহড়া ও সাংবাদিককে মাথায় রামদার কোপ দিয়ে রক্তাক্ত ও মারাত্মক জখম করার অভিযোগ উঠেছে।সশস্ত্র মহড়া ও উত্তেজনার মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল। তার অভিযোগ, হামিদ মণ্ডলের লোকজনের কাছে যাওয়ার পর পেছন থেকে রামদা দিয়ে তার মাথায় কোপ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ফকির মার্কেটসংলগ্ন ইন্ডেসরি পোশাক কারখানার সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত টুটুলকে সহকর্মীরা উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার মাথার ক্ষতস্থানে অস্ত্রোপচার ও সেলাই করা হয়েছে।
ঘটনার পেছনে কারখানাটির ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই কারখানার ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। হামিদ মণ্ডল ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন সকাল থেকেই হামিদ মণ্ডলের ছেলে যুবলীগ নেতা সোহেলের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কারখানার আশপাশে অবস্থান করছিল ও মহড়া দিচ্ছিল। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতেই এ মহড়া দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতির খবর পেয়ে কয়েকজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে যান। একপর্যায়ে প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল রাস্তার অপর পাশে অবস্থানরত লোকজনের কাছে পরিস্থিতি জানতে গেলে তার ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ।সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা জানাজানি হলে গাজীপুর সাংবাদিক মহলে হামিদ মন্ডলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।
আহত সাংবাদিক টুটুল বলেন, “আমি হামিদ মণ্ডলের লোকজনের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে আমার মাথায় রামদা দিয়ে কোপ দেওয়া হয়। তখন সেখানে স্থানীয় সেলিমের সাথে কথা বলছিলাম। এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। সহকর্মীরা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।” তিনি হামিদ মণ্ডল, তার ছেলে সোহেলসহ হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন। ঘটনাস্থলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট কালাম।
তিনি বলেন, “পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা ধাওয়া খেয়ে সেখান থেকে চলে এসেছি। ওই ফাঁকেই সাংবাদিক টুটুলকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে।”স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। কারখানাটির ঝুট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরেই ঘটনার দিন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা টুটুলের মাথার ক্ষতস্থানে চিকিৎসা দেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. দূর্জয় জানান, আঘাতে মাথার কয়েকটি স্তর কেটে গেছে। তিনি বলেন, “ক্ষতস্থান সেলাই করে দেওয়া হয়েছে। তবে সিটি স্ক্যান করার পর তার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।” শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, আহত সাংবাদিককে গুরুত্বের সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি বলে দিয়েছি আহত সাংবাদিকের চিকিৎসা গুরুত্বসহকারে করতে। আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করব।”খবর পেয়ে প্রতিদিনের কাগজ-এর বিশেষ প্রতিনিধি মো. আখতার হোসেন হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি আহত সাংবাদিকের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে তার চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলেন। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাব্বানি জানান, পুলিশ ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য এসআই নজরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসআই নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ বা ছবি থাকলে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো পুলিশের কাছে দেওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।ঘটনার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই কারখানার ঝুট সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
কারা এই ব্যবসার সুবিধাভোগী, কীভাবে ঝুটের নিয়ন্ত্রণ চলছে ও এর পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে সাংবাদিকের ওপর হামলার নেপথ্যের কারণও আরও স্পষ্ট হতে পারে।ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সাংবাদিকদের ধারণ করা ছবি ও ভিডিও এবং পুলিশের তদন্তে হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসতে পারে।
তবে হামিদ মণ্ডল ও তার ছেলে সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি। হামিদ মন্ডলের মোবাইলে বার বার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। সাংবাদিকের ওপর এমন হামলার ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরায়েল হাওলাদার।তিনি বলেন, “সাংবাদিকের ওপর মারাত্মক আঘাতের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।”

আপনার মতামত লিখুন :