গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ইন্ডেসর পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগের পর ঘটনাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাংবাদিকের করা মামলায় ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হামিদ মন্ডল প্রধান আসামি হওয়ার পর দায় এড়াতে প্রথমে তার স্ত্রীকে দিয়ে বিএনপির প্রতিপক্ষ গ্রুপের অ্যাডভোকেট আব্দুল কালাম ও যুবদল নেতা মিন্টু সরকারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে মিন্টু সরকারের স্ত্রী সারমিন আক্তার হামিদ মন্ডলকে প্রধান বিবাদী করে পাল্টা অভিযোগ দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গাছার ডেগেরচালা এলাকায় ইন্ডেসর পোশাক কারখানার সামনে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া চলে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ধারণ করতে গেলে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুলের ওপর হামলা হয়। তার মাথায় রামদার কোপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আহত সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুল বাদী হয়ে গাছা থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হামিদ মন্ডলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপরই ঘটনার দায় ও ঝুট ব্যবসাকে ঘিরে সংঘর্ষের বর্ণনা নিয়ে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
হামিদ মন্ডলের পক্ষ থেকে প্রথমে তার স্ত্রী আঞ্জুয়ারা থানায় একটি অভিযোগ করেন। এতে অ্যাডভোকেট আব্দুল কালামকে প্রধান বিবাদী ও যুবদল নেতা মিন্টু সরকারকে ৩ নম্বর বিবাদী করে ২০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগে দাবি করা হয়, তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইন্ডেসর গার্মেন্টসের ঝুট নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। পরে আতাউর মার্কেটে হামলা, ভাঙচুর এবং আতাউর এন্টারপ্রাইজ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়।
তবে মিন্টু সরকার পক্ষের দাবি, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর হামিদ মন্ডল নিজেকে রক্ষা এবং মূল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই তার স্ত্রীকে দিয়ে প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ করিয়েছেন। তাদের দাবি, ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সেদিনের ঘটনার দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপানোর উদ্দেশ্যেই পাল্টা বর্ণনা দাঁড় করানো হয়েছে।
হামিদ মন্ডলের স্ত্রীর অভিযোগের পর মিন্টু সরকারের স্ত্রী সারমিন আক্তার থানায় পাল্টা অভিযোগ করেন। সেখানে হামিদ মন্ডলকে ১ নম্বর বিবাদী করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা কয়েকজনসহ মোট ১৮ জনের নাম এবং অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
সারমিন আক্তারের অভিযোগে বলা হয়েছে, ইন্ডেসর পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে হামলা চালানো হয়। তার শ্লীলতাহানি, স্বর্ণের চেইন ও নগদ অর্থ নেওয়া এবং বসতঘর ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগও করা হয়েছে।এই অভিযোগেই সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলের ওপর হামলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে হামলাকারীরা সাংবাদিক টুটুলের ওপর আক্রমণ করে তাকে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে।
দুই অভিযোগ পাশাপাশি রাখলে একই দিনের ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। হামিদ মন্ডলের স্ত্রীর অভিযোগে কালাম-মিন্টু পক্ষকে অস্ত্রধারী ও হামলাকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে মিন্টুর স্ত্রীর অভিযোগে হামিদ মন্ডলকে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তার পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও সাংবাদিককে আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগ দায়েরের ধারাবাহিকতা নিয়েও। সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় হামিদ মন্ডলকে প্রধান আসামি করে সাংবাদিক টুটুলের মামলা হওয়ার পর হামিদ মন্ডলের স্ত্রী প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং এরপর মিন্টু সরকারের স্ত্রী পাল্টা অভিযোগ দেন। ফলে প্রথম অভিযোগটি সাংবাদিকের মামলার দায় এড়ানো কিংবা ঘটনার গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার কৌশল ছিল কি না, তা নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
তবে হামিদ মন্ডলের স্ত্রীর অভিযোগকে ‘সাজানো’ বা ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ হিসেবে এখনই চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং আহত সাংবাদিকের মামলার তথ্য যাচাই করলেই সেদিন ডেগেরচালায় কারা অস্ত্র নিয়ে এসেছিল, কারা হামলা চালিয়েছে এবং পাল্টা অভিযোগের নেপথ্যে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—তার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
গাছার স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকের ওপর হামলাসহ ১৩ আগস্টের পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। একই ঘটনাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের আড়ালে যেন সাংবাদিকের ওপর হামলার মূল ঘটনা চাপা না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন :