প্রতিদিনের কাগজে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর মুক্তির পথে অনিল কান্তি শীল

মোঃ হাসান , বান্দরবান, জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম

প্রতিদিনের কাগজে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর মুক্তির পথে অনিল কান্তি শীল

ফাইল ফটো

পাঁচ বছর আট মাস তেরো দিনের অন্ধকার শেষে অবশেষে মুক্তির আলো দেখতে যাচ্ছেন ৭০ বছর বয়সী অনিল কান্তি শীল। ‘নথিহীন বন্দিত্ব’-এর এই বিরল ও উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে আসে প্রতিদিনের কাগজের বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি মোঃ হাসানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এরপরই নড়ে বসে সংশ্লিষ্ট মহল। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের (লিগ্যাল এইড) উদ্যোগে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে হাইকোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করেন।

সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের ৩ নম্বর কোর্টে বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। লিগ্যাল এইডের পক্ষে অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান সেলিমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। ২০২০ সালের নভেম্বরের শুরুতে হঠাৎ করেই তাকে আটক করে পুলিশ। জানানো হয়েছিল তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট রয়েছে। পরে চট্টগ্রাম থেকে তাকে বান্দরবান জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময়েও তার বিরুদ্ধে কোনো মামলার সুস্পষ্ট নথি বা বিচারিক অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। এভাবেই বিনা বিচারে প্রায় অর্ধযুগ কারাগারে কাটে তার জীবনের মূল্যবান সময়।

পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন আদালত ও দপ্তরে খোঁজ করেও কোনো সুরাহা পাননি। অনিশ্চয়তা আর হতাশা তাদের দিনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে। ঠিক এই সময় প্রতিদিনের কাগজে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে অনিল কান্তি শীলের এই করুণ বাস্তবতা। প্রতিবেদনের পর বিষয়টি বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের নজরে আসে এবং শুরু হয় আইনি লড়াই যার ফল মিলেছে হাইকোর্টের এই আদেশে। বান্দরবান জেলা কারাগারের চিম্বুক-২ নম্বর ওয়ার্ডে কাটানো দিনগুলো যেন ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা। হয়তো অনিল কান্তি শীল নিজেও ভাবেননি একদিন এই কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে আবারও মুক্ত আকাশের নিচে ফিরতে পারবেন। কিন্তু আইনের সহায়তায় সেই অসম্ভবই আজ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।

মেয়ে পুষ্পা শীল বলেন, “আমরা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন শুধু অপেক্ষা বাবা ঘরে ফিরবেন। যারা বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।” অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান সেলিম বলেন, “বিষয়টি নজরে আসার পর আমরা দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করি। আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন এখন তার মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই।” বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার মনজুরুল ইসলাম বলেন, “হাইকোর্টের আদেশ হাতে পেলেই দ্রুততার সঙ্গে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।”

তবে এই মুক্তির আনন্দের মাঝেও থেকে যায় এক গভীর প্রশ্ন জীবনের অমূল্য এই দীর্ঘ সময় কি কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব? রাষ্ট্র কি পারবে এই অন্যায়ের যথাযথ প্রতিকার দিতে? এক নিরপরাধ মানুষের জীবনের এই দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়ের দায় কে নেবে এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। একজন বৃদ্ধ পিতার মুক্তি যেমন একটি পরিবারের স্বস্তি, তেমনি এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার প্রতি এক নীরব কিন্তু গভীর প্রশ্নও তুলে দেয়।

Link copied!