তিন মাস পর ১সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে সুন্দরবন: প্রবেশ করতে পারবেন জেলে ও পর্যটকরা

এস কে সিরাজ , শ্যামনগর,সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

তিন মাস পর ১সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে সুন্দরবন: প্রবেশ করতে পারবেন জেলে ও পর্যটকরা

ফাইল ফটো

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেওয়া হবে সুন্দরবনের দুয়ার। আর মাত্র ছয় দিন পর সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ পাবেন উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালিরা। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হবে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবিকা বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে থাকা জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার।

তবে নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ এই সময়ে সুন্দরবনসংলগ্ন মানুষের জীবন-সংসার কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা কষ্টের গল্প। উপকূলের বহু পরিবারকে ধারদেনা করে, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়ে সংসারের খরচ চালাতে হয়েছে। অনেকের ঘরে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। আবার সুন্দরবনে গোপনে প্রবেশ করে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের চেষ্টা থাকলেও বনদস্যু ও ডাকাতদের ভয়েও অনেকে ঝুঁকি নিতে পারেননি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকার বাসিন্দা  আব্দুর রহিম গাজী বলেন, “সুন্দরবন বন্ধ থাকার সময়ে আমাদের সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসারের খরচ চালাতে হয়েছে। সুন্দরবনে না যেতে পারায় আয়-রোজগারের বড় একটি পথ বন্ধ ছিল। রাতে লুকিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরার কথা মনে হলেও ডাকাতদের ভয়ে সেটিও সম্ভব হয়নি। এখন বন খুলবে এটাই আমাদের জন্য বড় আশার বিষয়।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর গ্রামের জেলে লিয়াকত আলীও একই ধরনের কষ্টের কথা জানান। তিনি বলেন, “বন বন্ধ থাকার সময় অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। যারা সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের জন্য এই সময়টা খুব কঠিন। ধারদেনা করে কোনোভাবে দিন পার করতে হয়েছে। বন খুললে আবার নৌকা নিয়ে বনে যেতে পারব, আয়-রোজগার শুরু হবে এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা।

স্থানীয় জেলে ও বাওয়ালিরা জানান, সুন্দরবন তাদের কাছে শুধু একটি বন নয়, এটি তাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। শত শত পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বৈধ বনজ সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। দীর্ঘ সময় বন বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে না পেয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।

এদিকে সুন্দরবন খোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে বন বিভাগ। জেলে-বাওয়ালিদের নিরাপদে প্রবেশ, অনুমতিপত্র প্রদান এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দীনের কাছে সুন্দরবন খোলার আগে বন বিভাগের প্রস্তুতি এবং জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, সুন্দরবন খুলে দেওয়ার পর জেলে-বাওয়ালিদের বৈধভাবে বনে প্রবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বনদস্যু ও (ডাকাতদের) তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ জাল, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী শিকারসহ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। জেলেরা বলছেন, নিরাপদ পরিবেশে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ পেলে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবেন তারা। তবে সুন্দরবনে প্রবেশের পর যাতে ডাকাতের আতঙ্কে জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল জোরদারের দাবি তাদের।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের দুয়ার খোলার দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই উপকূলের জেলে-বাওয়ালিদের মধ্যে বাড়ছে ব্যস্ততা। কেউ নৌকা ও জাল প্রস্তুত করছেন, কেউ নৌযানের মেরামত করছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা কিছুটা লাঘবের আশায় নতুন করে সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘ তিন মাসের অপেক্ষার পর সুন্দরবন খুলে গেলে উপকূলের হাজারো মানুষের জীবনে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে এমন প্রত্যাশাই এখন জেলে-বাওয়ালি ও সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর।

Link copied!