এক মুঠো গুটি আর মাটির কয়েকটি দাগেই জমে ওঠে বুদ্ধির খেলা

মোঃ মুঈদ চৌধুরী , তারাগঞ্জ, রংপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

এক মুঠো গুটি আর মাটির কয়েকটি দাগেই জমে ওঠে বুদ্ধির খেলা

ফাইল ফটো

রাস্তার পাশে বসেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই, বুদ্ধি-কৌশল আর ধৈর্যের খেলায় মেতে ওঠেন বৃদ্ধ থেকে তরুণ স্থানীয়দের কাছে যা ‘পাইত’ বা ‘ষোল গুটি’ খেলা নামে পরিচিত। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল রাস্তার পাশে মাটিতে বসে থাকা কয়েকজন বয়স্ক মানুষ। চারপাশে কোনো আয়োজন নেই, নেই কোনো মাঠ বা খেলাধুলার সরঞ্জাম। তবুও তাদের চোখেমুখে ছিল গভীর মনোযোগ। কেউ একজন মাটির ওপর আঁকা ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ হাতে থাকা ছোট ছোট গুটি সরিয়ে দিচ্ছেন। 

দৃশ্যটি দেখে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল জাগল। রাস্তার পাশে মাটিতে বসে তারা আসলে কী করছেন? কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করা হলো। কি ব্যাহে, কি খেলায়ছেন? মৃদু হেসে বৃদ্ধের উত্তর, ৩২ গুটি খেলা খেলাইছি।কথাটি শুনেই কৌতূহল যেন আরও বেড়ে গেল। কীভাবে খেলেন এই খেলা? কেনই বা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষগুলো এখনো এই খেলায় এতটা আগ্রহী? বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারাগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে ৩২ গুটি শুধু একটি খেলা নয়, এটি অনেকের কাছে অবসর কাটানোর আনন্দ, আড্ডার উপলক্ষ এবং পুরোনো দিনের স্মৃতিকে ধরে রাখার একটি মাধ্যম। স্থানীয়দের ভাষ্য, তারাগঞ্জের অনেক মানুষ অবসর সময়ে ৩২ গুটি খেলতে বসেন।

বিশেষ করে বয়স্কদের কাছে খেলাটি বেশ জনপ্রিয়। তবে শুধু বয়স্করাই নন, নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণও এই খেলায় আগ্রহ দেখান। এটি এমন একটি খেলা, যেখানে শুধু গুটি সরালেই হয় না; প্রতিটি চাল দেওয়ার আগে ভাবতে হয় প্রতিপক্ষ কী চাল দিতে পারেন। ফলে খেলাটিতে প্রয়োজন হয় বুদ্ধি, ধৈর্য, কৌশল ও সতর্কতার। অনেকটা নীরব লড়াইয়ের মতো। দুজন খেলোয়াড় মুখোমুখি বসে থাকেন, কিন্তু তাদের আসল প্রতিযোগিতা চলে মাটির ওপর আঁকা ঘর আর গুটির চালের মধ্যে। স্থানভেদে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির নামেও রয়েছে ভিন্নতা। তারাগঞ্জের স্থানীয়দের কাছে এটি ‘৩২ গুটি’ নামে পরিচিত হলেও অনেকের মুখে শোনা যায় ‘পাইত খেলা’ কিংবা ‘ষোল গুটি খেলা’ নামও। নাম ভিন্ন হলেও খেলার মূল আনন্দ একই প্রতিপক্ষের গুটি কৌশলে কেটে নিজের গুটি দিয়ে জয় নিশ্চিত করা। এই খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর উপকরণ খুবই সহজলভ্য। আধুনিক কোনো বোর্ড বা দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত মাটিতে দাগ কেটে তৈরি করা হয় খেলার ঘর। এরপর দুই খেলোয়াড়ের জন্য আলাদা আকৃতি, ফলের বিচি কিংবা ঐটের টুকরো কে হিসেবে ব্যবহার করা হয়।দুই প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের থাকে ১৬টি করে গুটি। অর্থাৎ দুই পক্ষ মিলে মোট ৩২টি গুটি নিয়ে শুরু হয় খেলা। মাটিতে আঁকা ঘরগুলোই হয়ে ওঠে তাদের খেলার বোর্ড। আর সেই বোর্ডের প্রতিটি দাগ ও ঘরকে কেন্দ্র করেই চলে একের পর এক চাল। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, গুটিগুলো নির্দিষ্ট দাগ ও ঘর ধরে চাল দিতে হয়। কোনাকুনি দাগের গুটি কোনাকুনি পথে এবং উলম্ব দাগের গুটি নির্দিষ্ট নিয়মে চাল দেওয়া যায়। প্রতিপক্ষের গুটিকে কৌশলে ডিঙিয়ে যেতে পারলে সেই গুটি কাটা পড়ে। এভাবে একের পর এক প্রতিপক্ষের গুটি কমিয়ে আনাই খেলোয়াড়ের মূল লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত যে খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের সব গুটি কেটে ফেলতে পারেন, তিনিই হন বিজয়ী।

তাই এখানে তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। একটি ভুল চাল যেমন নিজের গুটি হারানোর কারণ হতে পারে, তেমনি সঠিক সময়ে দেওয়া একটি চাল পুরো খেলার চিত্র বদলে দিতে পারে। গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও ৩২ গুটি এখনো টিকে আছে মানুষের আগ্রহে। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের খেলার প্রচলন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিনের। তবে শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই ধরনের খেলা খেলতে দেখা যায়। একসময় বিকেল কিংবা অবসর সময় মানেই ছিল গ্রামের কোনো এক বাড়ির উঠান, রাস্তার পাশ কিংবা গাছের নিচে কয়েকজন মানুষের জমায়েত। গল্প-আড্ডার পাশাপাশি চলত গুটি চালাচালি। আজকের ব্যস্ত সময়ে সেই দৃশ্য আগের তুলনায় কমে এলেও একেবারে হারিয়ে যায়নি। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। প্রযুক্তির এই যুগে ৩২ গুটি খেলা আর শুধু গ্রামের মাটির ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সফটওয়্যার বা গেমের মাধ্যমেও এখন এই ধরনের খেলা খেলার সুযোগ রয়েছে।

ফলে মাটিতে বসে খেলার পুরোনো ঐতিহ্য যেমন কোনো কোনো এলাকায় টিকে আছে, তেমনি প্রযুক্তির হাত ধরে খেলাটি পৌঁছে গেছে নতুন প্রজন্মের কাছেও। একসময় যে খেলার জন্য প্রয়োজন হতো মাটিতে কয়েকটি দাগ আর হাতে কিছু গুটি, সেই খেলাই এখন জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মোবাইলের পর্দায়। তারাগঞ্জের রাস্তার পাশে সেই বৃদ্ধদের খেলা দেখতে দেখতে মনে হলো এটি শুধু দুইজন মানুষের সময় কাটানোর খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার আড্ডা, শৈশবের স্মৃতি, বুদ্ধির লড়াই এবং একসময়ের নির্মল বিনোদনের গল্প।আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিনোদনের ধরন পাল্টালেও মাটিতে দাগ কেটে, ১৬টি করে গুটি সাজিয়ে মুখোমুখি বসে খেলার সেই আনন্দ এখনো কিছু মানুষের কাছে অমলিন। হয়তো কোনো এক বিকেলে আবারও তারাগঞ্জের কোনো গ্রামের রাস্তার পাশে দেখা যাবে কয়েকজন মানুষ গোল হয়ে বসে আছেন, সামনে মাটিতে আঁকা ঘর, আর সেই ঘরের মধ্যে চলছে ৩২ গুটির নীরব অথচ জমজমাট লড়াই। কারণ কিছু খেলা শুধু খেলা নয় সেগুলো একটি অঞ্চলের মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।

 

Link copied!