ময়মনসিংহে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, থানায় অভিযোগেও মিলছে না প্রতিকার

জামাল উদ্দিন খান , ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

ময়মনসিংহে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, থানায় অভিযোগেও মিলছে না প্রতিকার

ফাইল ফটো

ময়মনসিংহে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে থানায় অভিযোগ পাওয়ার পরও দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং বিভিন্ন মহলের তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর দুই-তিন দিন, এমনকি পাঁচ দিন পার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নতুন করে হামলা, জমি দখল, লুটপাট ও মব সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে গৌরীপুর এলাকায় সাংবাদিক এইচ. টি. তোফাজ্জালকে মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গৌরীপুরে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বিভিন্ন ঘটনায় দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলার কয়েকটি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে নানা ব্যস্ততায় থাকেন। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তদবির সামলাতেই অনেক সময় পুলিশের ব্যস্ততা বেশি থাকে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না । ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের তদবির, অভিযুক্তদের পক্ষ নেওয়া এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পুলিশি কার্যক্রম প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ করেও প্রত্যাশিত প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার আকুয়া মড়লবাড়ি এলাকার এক বাসিন্দা গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁর অভিযোগ, পাঁচ দিন পার হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে তদন্তে যাননি। এর মধ্যে প্রতিপক্ষরা তাঁর ওপর ফের হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বর্তমানে হামলার আশঙ্কায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

শুধু কোতোয়ালি মডেল থানা নয়, মুক্তাগাছা,  ত্রিশাল থানা ও গৌরীপুর এলাকাতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ না করলে অনেক সময় ঘটনাস্থলে তদন্তে যেতে অনীহা দেখা যায়। এতে অভিযোগকারীরা একদিকে যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের হামলা বা হুমকির ঝুঁকিতেও পড়ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে অনেক অপরাধ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু অভিযোগের পর দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। তবে কয়েকজন ওসির গাফিলতির কারণে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

সচেতন মহলের মতে, থানায় অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক তদবির ও যেকোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায় ময়মনসিংহের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!