প্রতিদিন কলেজে আসা-যাওয়ার পেছনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। মাস শেষে এই ব্যয় দাঁড়ায় কয়েক হাজার টাকায়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত এই খরচ বহন করা কঠিন। এর ওপর বিয়ে, সংসারের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপে সীতাকুণ্ড সরকারি মহিলা কলেজের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির অর্ধেকের বেশি ছাত্রী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছেন না।
কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। তবে দুই শ্রেণিতেই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী অনিয়মিত। দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ব্যয় নিয়মিত উপস্থিতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদ মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, দূরবর্তী এলাকা থেকে কলেজে আসা অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন যাতায়াতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যাতায়াত খরচ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু যাতায়াত ব্যয় নয়, পারিবারিক বাস্তবতাও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। কারও ক্ষেত্রে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব বেড়েছে, আবার কেউ পরিবারের কাজ সামলাতে গিয়ে নিয়মিত কলেজে আসতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা কলেজ কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয় কমানো এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিবারিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন পাঠদান থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন না হয়, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত করার লক্ষ্যে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে কলেজ প্রশাসন। গত ৮ আগস্ট একাদশ শ্রেণির প্রায় ৩০০ অভিভাবককে নিয়ে একটি সচেতনতামূলক সভা করা হয়। সেখানে নিয়মিত কলেজে পাঠানো, ক্লাসে উপস্থিতির গুরুত্ব এবং পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা শেষে ওই শ্রেণির অভিভাবকদের নিয়েও একই ধরনের সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কলেজ প্রশাসন জানিয়েছে, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছাত্রীদের চিহ্নিত করে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাজিরা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির পাশাপাশি কলেজটিতে জায়গার সংকটও রয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি ডিগ্রি ও অনার্স কার্যক্রমও চালু রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৪ শতক জায়গার ওপর পরিচালিত হচ্ছে।
অধ্যক্ষের দাবি, একটি সরকারি কলেজের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য অন্তত ৫০ শতক জায়গা প্রয়োজন। তিনি জানান, কলেজের জমি ১৪ শতক হওয়ায় নতুন শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে সমস্যা হচ্ছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিগত সময়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও জায়গার অভাবে কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই বরাদ্দের অর্থ ফেরত গেছে। সীমিত জায়গার মধ্যেই উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি ও অনার্স কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছাত্রীদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কলেজ প্রশাসন।

আপনার মতামত লিখুন :