আবদুল্লাহ আল নোমান ,পটিয়া : চট্টগ্রামের পটিয়ায় যানজট নিরসন ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বাস টার্মিনাল। নির্মাণের পর প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। নির্ধারিত টার্মিনালের পরিবর্তে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা ও অপেক্ষা করানোয় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। পটিয়া পৌরসভার গিরিশ চৌধুরী বাজার এলাকায় নির্মিত বাস টার্মিনাল থাকলেও অনেক বাসচালক ও শ্রমিক মহাসড়কের ওপর কিংবা সড়কের পাশে বাস দাঁড় করিয়ে রাখেন। এতে মহাসড়কের একটি অংশ দীর্ঘসময় দখলে থাকে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে একই স্থানে একাধিক বাস দাঁড়ালে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। কখনো কখনো এর প্রভাব পৌরসদরের আশপাশের সড়কেও পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গিরিশ চৌধুরী বাজার এলাকায় নির্মিত বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটিতে বাস রাখার পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামার সুবিধাও রাখা হয়েছিল। মহাসড়কে যত্রতত্র বাস দাঁড় করানো বন্ধ করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পটিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান বলেন, প্রায় তিন মাস আগে বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পৌরসভায় বৈঠক হয়েছে। সেখানে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বাসগুলো টার্মিনালে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এখনো অনেকেই টার্মিনালে বাস রাখছেন না। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে পটিয়ার ট্রাফিক সার্জেন্টও বাস মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। এরপরও টার্মিনাল সচল না রাখলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পৌর শহরের যানজট নিরসনে বাস টার্মিনালের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ইউএনও আরও বলেন, নির্ধারিত টার্মিনাল থাকার পরও মহাসড়ক বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো গ্রহণযোগ্য নয়। বাস মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে টার্মিনালটি কার্যকরভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পটিয়া ট্রাফিক জোনের ইনচার্জ মো. আমীর ফারুক বলেন, এ বিষয়ে পটিয়া বাস মালিক সমিতির সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অবৈধ বাসস্টেশন থেকে বাস সরিয়ে নির্ধারিত পৌর বাস টার্মিনালে স্থানান্তরের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রায় দুই মাস আগে পৌর প্রশাসক ও পটিয়া ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে বাসস্টেশন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। শেষবারের মতো তাদের পুনরায় কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও বাস না সরালে সম্মিলিতভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে।
তবে বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে টার্মিনালটি ব্যবহারে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পটিয়া বাস-মিনিবাস মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, পৌর বাস টার্মিনালে বাস রাখার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। সেখানে নিরাপত্তা, পানি, বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি টার্মিনালের ভেতরে বড় বড় খানাখন্দ রয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে বাস রাখতেও মালিকরা অনাগ্রহী। তিনি বলেন, টার্মিনালে কেউ বাস রাখলে বিভিন্ন সময় গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালটি ইজারা নেওয়া হলেও ইজারাদাররা পর্যাপ্ত সংস্কার করছেন না। সেলিম উদ্দিন আরও বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে টার্মিনালের সংস্কারকাজ করা না হলে ইজারা বন্ধ করে নিজেরাই সংস্কার করে টার্মিনালটি গাড়ি রাখার উপযোগী করে তুলব।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন যাত্রী ও পথচারীরা। দ্রুতগতির যানবাহনের পাশে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, যাত্রী সংগ্রহের সুবিধা এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছাড়ার কারণে অনেক চালক সড়কের পাশে বাস থামান। তবে দীর্ঘসময় মহাসড়কের ওপর বাস রেখে দিলে যান চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই যানজট নিরসন হবে না; সেটির নিয়মিত ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের ওপর বাস দাঁড় করানো বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা টার্মিনালটি সংস্কার করে কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলে পটিয়া পৌরসদরের যানজট কমার পাশাপাশি যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তাও বাড়বে। সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো যেন আর অকার্যকর হয়ে পড়ে না থাকে, সে জন্য দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন :