পর্যটক সীমিতকরণ করে পর্যটনখাতে অপার সম্ভাবনা দেখছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে ৩১ জানুয়ারি বন্ধ না করে আরও কিছুদিন সময় বাড়িয়ে দিলে পর্যটনখাতে আরও সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। আর তাই আরও কিছুদিন সময় বাড়ানোর আকুতি করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ সকলে।
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হিসেবে পরিচিত সেন্টমার্টিনে এখন পর্যটক যাতায়াত করছে। চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। সেন্টমার্টিনের স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া বন্ধ হলে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় রোজগার বন্ধ হবে।
প্রতিবেদক সেন্টমার্টিনে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান নানান অনিয়ম। সরকারিভাবে প্লাস্টিক পণ্য সেখানে নেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও প্রতিদিন টেকনাফ থেকে ইঞ্জিন চালিত বোটে করে প্রতিদিন কয়েক হাজার পানির বোতল সেন্টমার্টিনে প্রবেশ করছে। যদিওবা পর্যটকেরা কক্সবাজার থেকে ওঠার সময় পানির বোতল নিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু সেন্টমার্টিনে গিয়ে ঠিকই বোতলজাত পানি পাচ্ছে বিভিন্ন হোটেলে। এমনকি প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ হাজার পানির বোতল বিক্রি হয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে চিপসসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রী সেখানে সচরাচর পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে সমুদ্র বালিয়াড়িতে বাইক ভাড়া দেওয়া এখন নিয়মিত ব্যবসা হিসাবে দাঁড়িয়েছে বলে জানান সচেতন মহল।
স্থানীয়রা বলছেন, পর্যটক আসার কারণে এই সেন্টমার্টিনে প্রায় ৩০০ টমটম চালক, নিজ বাড়ির আঙিনায় করা কটেজ ভাড়া দিয়ে চলে—এমন পরিবার প্রায় শতাধিক, শুঁটকি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে যাচ্ছে। পর্যটক না থাকলে এরা বেকার হয়ে পড়বে। এর কারণে সেন্টমার্টিনবাসীর ওপর বড় ধরনের একটি ধাক্কা আসতে পারে।
স্থানীয় প্রবাল রিসোর্টের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, ‘দেশের সবচাইতে সুন্দর দ্বীপ এই সেন্টমার্টিন। দ্বীপটি দেখার জন্য প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসছে এই দ্বীপে, যার কারণে আমাদের মতো অনেক পরিবার এখন ভালোভাবে জীবন ধারণ করতে পারছে। যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে এই সেন্টমার্টিনে অনেক বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সরকার পর্যটক সীমিত রেখে যদি সময়টা বাড়িয়ে দেন তবে স্থানীয়দের বাঁচার সুযোগ থাকবে। এই দ্বীপে আগে জেলে ছিল, এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কারণে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়াটা বিপদজনক। এখন যারা বিপদ হাতে নিয়ে মাছ ধরতে যায় তারা কোনো না কোনো বিপদে পড়ছে।’
সেন্টমার্টিনের ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ জানান, ‘বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এই সেন্টমার্টিন। এই দ্বীপে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার লোকের বসবাস। আর এই সব লোকের একমাত্র ব্যবসা হলো পর্যটনখাত। সরকার ২ মাসের জন্য পর্যটক আসা নির্ধারণ করার কারণে দ্বীপবাসীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসাবে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ রক্ষা করে আরও কিছুদিন যদি দ্বীপে পর্যটক আসার ব্যবস্থা করা হয় তবে দ্বীপবাসীর জন্য বড় ধরনের উপকার হবে। অন্যথায় এই অনেক গরিব অসহায় দ্বীপবাসী অপরাধ জগতে পা বাড়াবে। এমন কি প্রায় ৩০০ টমটম চালকের পরিবার না খেয়ে জীবনযাপন করবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আরেকটি মাস বাড়ালে সেন্টমার্টিনবাসী কিছু রোজগার করে বাকি সময়টুকু চলতে পারবে।’
সেন্টমার্টিনের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘পর্যটক না আসলে আর্থিক অভাব দেখা দেবে। পরিবারে অশান্তি দেখা দেবে। এমন পর্যায়ে গেলে সংসার ভেঙে যেতে পারে। বিগত দিনে এমন পরিস্থিতি হয়েছে। তাই পর্যটক সীমিত করে যতদিন পর্যটক আসা সম্ভব ততদিন পর্যটক যেন আসতে পারে সে ব্যবস্থা করার অনুরোধ করছি।’
সেন্টমার্টিনে ঘুরতে আসা শোভন জানান, ‘কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন আসার সময়টুকু অসাধারণ মুহূর্ত। সেন্টমার্টিনে নেমে ভালো লাগলো। সবচাইতে বড় কথা নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। এখানকার মানুষ খুবই আন্তরিক। কিছুদিনের মধ্যে পর্যটক আসা বন্ধ হবে জানতে পারলাম। এখানকার অবস্থা দেখে বুঝতে পারলাম স্থানীয়রা পর্যটক নির্ভর জীবন ধারণ করে থাকে। যদি পর্যটক সীমিত করে আরও কিছুদিন চালু রাখা হয় তবে স্থানীয়রা কিছুটা আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকবে।’
পর্যটনখাতে ট্যুরিস্ট গাইড সংগঠনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম জানান, ‘পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যাতায়াত বন্ধ হলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। এই সেন্টমার্টিনে ব্যবসা করছে কক্সবাজারের স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষ। তাদের আয় রোজগার বন্ধ হবে এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপবাসী কষ্টে পড়বে।’
আগামী ৩১ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনে পর্যটক বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয়দের জন্য কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা আছে কিনা জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘স্থানীয়দের নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করছে। আশা করছি স্থানীয়রা তেমন সমস্যায় পড়বে না।’
আপনার মতামত লিখুন :