একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের (জোড়খালী ও কোরালিয়া) ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরাঞ্চলের চিত্র দেখলে মনে হয়, এ যেন রাষ্ট্রের মানচিত্রে থাকা এক অবহেলিত উপনিবেশ। যেখানে উন্নয়ন কেবল শোনা যায় নির্বাচনের মাইকিংয়ে, আর বাস্তবে মানুষের জীবন ঝুলে থাকে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর।
জানা যায়, প্রায় তিন হাজার মানুষের একমাত্র যাতায়াত পথ এই বাঁশের সাঁকো। প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এই মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে শিক্ষার পথে হাঁটে। সামান্য বৃষ্টি, পা পিছলে যাওয়া বা বাঁশ ভেঙে পড়লেই ঘটে দুর্ঘটনা।
গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সাঁকোটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। মানুষ কোমরসমান কাদা পানিতে নেমে নৌকায় পারাপার হয়। শিশু, বৃদ্ধ, নারী কারও জন্য নেই নিরাপদ ব্যবস্থা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সময় স্কুলছুট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়, রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। "ভোটের সময় সেতু, ভোটের পর সাঁকো" এলাকাবাসীর ক্ষোভের মূল জায়গা রাজনীতি। প্রতিটি নির্বাচনে এই সাঁকোই হয়ে ওঠে প্রার্থীদের প্রধান হাতিয়ার।
স্থানীয়রা আরও জানান, একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে। ছবি, ভিডিও, দুর্ঘটনার তথ্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো টেকসই উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠছে - বরাদ্দ আসে না কেন? দ্বীপবাসী কি বরাদ্দের যোগ্য নয়? "এটা অবহেলা নয়, এটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা" বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়রা আরও বলছেন, আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর ওপর দিয়েই যাতায়াত করি!
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি আর সাধারণ অবহেলা নয়—এটি স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ—সব মৌলিক অধিকার থেকে এই জনপদকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম (৬৫) বলেন, রাতের বেলা কেউ অসুস্থ হলে আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি—ভোর পর্যন্ত যেন বাঁচে। কারণ অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, খালি ভ্যানও ঢুকতে পারে না। অনেক মানুষ সাঁকো পার করতে গিয়েই পড়ে গিয়ে আরও কঠিন আকার ধারণ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা গৃহবধূ রাশেদা বেগম বলেন, গর্ভবতী মেয়েদের নিয়ে সবচেয়ে ভয়। কাদা পানিতে নৌকায় করে নিতে হয়। এর চেয়ে আর কী কষ্ট হতে পারে। আমরা ছোটবেলা থেকে ভোটের সময় শুনে আসছি সেতু হবে, তার পরে নেতারও খবর নেই সেতুরও খবর নেই!
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সালাউদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে সবাই ভোট চাইতে আসে। বলে—‘সেতু হবে, কালভার্ট হবে’। কিন্তু ভোট শেষ হলে কেউ আর ফিরে তাকায় না। ২০ বছর ধরে একই কথা শুনছি।
একই অভিযোগ তুললেন বৃদ্ধ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সরকার বদলায়, এমপি বদলায়, চেয়ারম্যান বদলায়—কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না।
সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, একটি সেতু না থাকায় একটি প্রজন্ম অশিক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু যোগাযোগ সমস্যা নয়, এটা ভবিষ্যৎ ধ্বংসের নীলনকশা।
এলাকাবাসীর কণ্ঠে এখন আর অনুরোধ নয়, তাদের স্পষ্ট দাবি—এই বাঁশের সাঁকোর জায়গায় দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণ করতে হবে। নচেৎ উন্নয়নের গল্প, স্মার্ট বাংলাদেশের বুলি—সবই থাকবে কেবল পোস্টার আর বক্তৃতায়। একটি সেতু এখানে শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়। এটি হবে মানুষের জীবনরক্ষার গ্যারান্টি, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রমাণ। প্রশ্ন একটাই—হাতিয়ার তমরদ্দির মানুষ আর কতদিন বাঁশের সাঁকোয় ঝুলে থাকবে উন্নয়নের অপেক্ষায়?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় মেম্বার বলেন, হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী ও তার পরিবার দীর্ঘ এক যুগের শাসন করেছেন। এই শাসন আমলেই এই দুই গ্রামের বাসিন্দারা বহুবার গেলেও একটা সেতু করে দিতে পারেননি। এছাড়া বারবার উপজেলা প্রশাসনের কাছে মৌখিক ও লিখিত আবেদন দিলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। হাতিয়া একটি অবহেলিত দ্বীপ, তার মধ্যে এই দুই গ্রামের বাসিন্দারা আরও বেশি অবহেলিত। শুধু কথা একটাই বলে—প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু বরাদ্দ আসেনি!
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন বলেন, তমরুদ্দি ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ সমস্যার বিষয়ে আমরা অবগত রয়েছি। এলাকাবাসীর চলাচলে যে অসুবিধা হচ্ছে, তা প্রশাসনের নজরে আছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি। বরাদ্দ ও অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :