নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় চলাচলকারী অবৈধ স্পিডবোট যেন মৃত্যুর গাড়ি হয়ে উঠেছে। নিয়ম না মেনে, প্রশাসনের চোখের সামনেই প্রতিদিন অর্ধশতাধিক লাইসেন্সবিহীন স্পিডবোট চলাচল করছে। এর অধিকাংশই চালাচ্ছেন অদক্ষ মাঝি, নেই কোনো লাইফ জ্যাকেট বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যাত্রী পারাপারে নেই অনুমোদন, নেই পরিবহনের ফিটনেস সনদ। ঘাট থেকে যাত্রী পরিবহনেও নেই নিয়ন্ত্রণ। ১২ জনের ধারণক্ষমতায় ১৮ থেকে ২০ জন যাত্রী নেওয়া হচ্ছে, যে যার মতো করে যাত্রী পারাপার করছে। বোট মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে। নিরুপায় হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব ফিটনেসবিহীন স্পিডবোটে মেঘনা পাড়ি দিতে হচ্ছে নোয়াখালী-হাতিয়ার নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট রুটে চলাচলকারী হাজার হাজার যাত্রীকে। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
হাতিয়া একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় এখানকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নদীপথ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-হাতিয়া, ঢাকা-হাতিয়া ও নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট রুটে অধিকাংশ মানুষ নদীপথে যাতায়াত করেন। জেলা সদরসহ সড়কপথে যাওয়ার জন্য দ্বীপের মানুষজনকে নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট রুটে চলাচল করতে হয়। প্রতিদিন এই রুটে ৬-৭ হাজার মানুষ যাতায়াত করে।
দ্রুত চলাচলের জন্য এই রুটে ব্যক্তিমালিকানাধীন স্পিডবোট রয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও ত্রুটিপূর্ণ ফিটনেসবিহীন বোট চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না বলে অভিযোগও রয়েছে। বিগত পুরো বছরে একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করা হলেও ঘাটের অবৈধ স্পিডবোট মালিকরা যেন তা ভুলেই গেছে, তাই তাদের অনিয়ম রোধ করা যায়নি। সিন্ডিকেটের দাপটে প্রশাসনও যেন নির্বিকার।
হাতিয়ার মতো একটি দুর্গম এলাকার জন্য নিরাপদ যাতায়াত অপরিহার্য। তবে যদি সেই যাতায়াত ব্যবস্থাই হয় অবৈধ, বেপরোয়া, আর প্রাণঘাতী—তাহলে দায় কার? প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারি অনুমোদন নেই, বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতিও নেই। তবুও হাতিয়ার নলচিরা ঘাট থেকে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই স্পিডবোটগুলো ছুটে চলেছে ঘণ্টায় ৫০-৬০ কিমি বেগে—যেকোনো সময় যান্ত্রিক ত্রুটি, ঢেউয়ের ধাক্কা, অথবা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা।
তথ্য বলছে, গত এক বছরে এই অবৈধ স্পিডবোটে দুর্ঘটনায় প্রাণ না গেলেও অন্তত বহু আহত হয়েছে। তবুও প্রশাসনের নীরবতা জনমনে প্রশ্ন তুলছে—কে এদের রক্ষা করছে? কে এই ‘মৃত্যুর দালালদের’ ছায়া হয়ে আছে?
তথ্য বলছে, বিগত বছর ২৩ জুন ধারণক্ষমতার বাইরে ২৮ জন যাত্রী নিয়ে হাতিয়ার নলচিরা ঘাট থেকে রওনা হয় একটি স্পিডবোট। মাঝ নদীতে হঠাৎ বোটের তলা ফেটে পানি ঢুকে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে যাত্রীরা নিজেদের জামাকাপড় দিয়ে ভাঙা অংশ চেপে ধরেন। উপায় না পেয়ে চালক স্রোতের দিকে চালিয়ে বোটটিকে ঘাটের অনেক দূরে তীরের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। এতে প্রাণে বাঁচলেও খোয়া যায় অনেকের ব্যাগসহ মূল্যবান জিনিসপত্র।
জানা যায়, ওই ঘটনার পর তীরে উঠে প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে চালকের কাছ থেকে বোটের মালিকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কল দেন। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও ত্রুটিপূর্ণ বোটে যাত্রীবহনের কারণ জানতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে যান বোটের মালিক। এ সময় মালিককে মোবাইলে যাত্রীদের হুমকি দিতেও শোনা যায়। অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিজেদের ত্রুটির কারণে এত বড় একটি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা যাত্রীদের সঙ্গে কোনো সহমর্মিতা দেখাননি ওই মালিক, যা তার প্রভাবশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ডুবে যাওয়া স্পিডবোটের মালিক মো. পিটু। মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার আরও ব্যবসা রয়েছে। উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান ইমাম তার ব্যবসায়িক অংশীদার। এজন্য ন্যায়-অন্যায় কোনো কিছুতে তোয়াক্কা করেন না তিনি। তবে স্পিডবোটটির মালিক মো. পিটু যাত্রীদের সঙ্গে উত্তেজিত আচরণ করার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি নিছকই একটি দুর্ঘটনা ছিল। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি চালক আমাকে জানাননি।
আরো জানা যায়, বিগত বছরের মে মাসের শেষের দিকে নলচিরা থেকে ২২ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট চেয়ারম্যান ঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। নদীতে ভাসতে থাকে বোটটি। সামনে অন্ধকার নেমে আসছে, যাত্রীদের মধ্যে হতাশা বেড়ে যায়। বারবার ফোন দেওয়ার পরও মালিক ফোন রিসিভ করেননি। পরে ঘাটে ফোন দিয়ে অন্য একটি বোট এনে যাত্রীদের ঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয়।
তথ্য বলছে, হাতিয়ার নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট রুটে যাত্রী পারাপারে বর্তমানে ৮৮টি স্পিডবোট রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর সময় এই রুটে স্পিডবোট ছিল মাত্র ২২টি এবং সেগুলোতে মোটামুটি ফিটনেস ছিল। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা বদলের পর যে যার মতো করে এসব বোট নামিয়েছেন যাত্রী পরিবহনে। সেগুলোর অধিকাংশের নেই ফিটনেস, নেই অনুমোদন। ঘাট থেকে যাত্রী ওঠানামায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে এগুলো। ঘাটে থাকা একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, এসব স্পিডবোটে যাত্রী পরিবহনে সিরিয়াল দেওয়ার জন্য দুই ঘাটে লাইনম্যান নিয়োগ করা আছে। তারা প্রতিটি বোট থেকে প্রতি ট্রিপের জন্য ১০০ টাকা করে নেন। তাদের মধ্যে আছে আবার ভিন্ন সিন্ডিকেট। অর্থের বিনিময়ে তারা ফিটনেসবিহীন বোট সিরিয়াল দিতে সহযোগিতা করে। অনেক সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহনে চালকদের সঙ্গে তাদের সখ্য থাকে। এই রুটে চলাচলকারী ৮৮টি স্পিডবোটের মধ্যে মাত্র ১৮টির ফিটনেস সনদ রয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় অবৈধ স্পিডবোট ব্যবসা বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে—কিন্তু জনগণের জীবনের কোনো মূল্য নেই! এটা শুধু পরিবহন নয়—এটা হাতিয়ায় গড়ে ওঠা একটি অবৈধ অর্থনীতি। সরকারকে ট্যাক্স না দিয়ে মানুষ হত্যা করেও তারা লাভে থাকে!
হাতিয়ার মানুষ নদীঘেরা জীবনে অভ্যস্ত। কিন্তু এখন তারা ‘ভাসমান কবর’ নামে পরিচিত এই স্পিডবোটের যাত্রী। প্রতিদিন যখন একজন বাবা, মা বা শিশু উঠছে এসব নৌযানে, তখন তারা জানে না—ফিরবে কিনা।
স্থানীয়রা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ নৌযান চলাচলের পেছনে কিছু প্রভাবশালী নাম জড়িয়ে আছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে, অথচ জনগণের জীবনের কোনো মূল্য নেই। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত বা অভিযান নেই—যা কিছু হয়, সেটিও লোকদেখানো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বৈধ লাইসেন্স না থাকা মানেই জনগণের জীবন নিয়ে খেলা। একাধিক যাত্রীবাহী স্পিডবোটে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই, অথচ এটি আইনি অপরাধ। অদক্ষ চালকের হাতে দ্রুতগামী নৌযান মানেই একেকটা ভাসমান বোমা!
হাতিয়ার আলী হোসেন নামে একজন বাসিন্দা জানান, “জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের যাতায়াত করতে হয়। ঢেউ উঠলে মনে হয়, আর ফিরতে পারবো না। কোনো জ্যাকেট নাই, চালকরাও অদক্ষ তরুণ।”
হাতিয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম আদনান বলেন, হাতিয়া উপজেলার নদীপথ একদিকে যেমন জীবনরেখা, অন্যদিকে তা হয়ে উঠেছে মৃত্যুপাঁদ। প্রতিদিন শত শত যাত্রী এসব অবৈধ, ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন স্পিডবোটে করে চলাচল করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়, প্রতিবেদন তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তবে বদলায় না কিছুই। মানুষ যেন আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না ওঠে কোনো নৌযানে—এই সচেতনতা শুধু প্রশাসনের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত হোক এটাই প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি।
হাতিয়া নলচিরা ঘাট এলাকার জসীম উদ্দিন নামের একজন বাসিন্দা জানান, আমরা হাতিয়াবাসী চাই সমস্ত অবৈধ স্পিডবোট চলাচল বন্ধ করুক। লাইসেন্সধারী নৌযান ছাড়া কোনো যান চলবে না। নিয়মিত অভিযান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এবার থামাতেই হবে এই মৃত্যু যাত্রা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন বলেন, হাতিয়ার নৌপথে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত স্পিডবোট চলাচলের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যেসব স্পিডবোটের বৈধ কাগজপত্র নেই, যেগুলো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে কিংবা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করছে—সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে এসব অবৈধ বোট জব্দ ও চলাচল বন্ধ করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :