সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামাতে একমত বিজিবি-বিএসএফ

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মাধ্যমে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, হামলা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে যৌথ উদ্যোগ জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে বিজিবি ও বিএসএফ।

শুক্রবার (১২ জুন) রাতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিজিবির ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অন্যদিকে বিএসএফের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক প্রবীন কুমার। আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের বিষয়েও প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।

সম্মেলনে সীমান্তে বিএসএফ সদস্য বা ভারতীয় নাগরিকদের অস্ত্র ব্যবহারের ফলে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিজিবি মহাপরিচালক। তিনি সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয় যে আন্তরিক, সৎ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি, নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও সম্মত হয় দুই বাহিনী।

বৈঠকে বিএসএফের মাধ্যমে রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক এবং ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পুশ-ইনের ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। মহাপরিচালক বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি), পূর্ববর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি ও প্রটোকলের পরিপন্থী।

তিনি আরও বলেন, পুশ-ইনের শিকার অনেক মানুষ মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ক্ষুধা ও রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি রয়েছেন জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন এমন প্রবীণরাও। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, কোনো ব্যক্তির বাংলাদেশি নাগরিকত্ব যাচাই হলে প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার আওতায় তাকে দ্রুত গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে বিএসএফকে এ ধরনের পুশ-ইন কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে বিদ্যমান প্রটোকল অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।

জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পরে উভয় পক্ষ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয় এবং পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিতে এসব প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

সীমান্তে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো (এসআরএফ) নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বিজিবি মহাপরিচালক জানান, বিভিন্ন স্থানে নির্মিত এসআরএফ প্যাচে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া ৩৯টি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমার ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফ বা ভারতীয় নাগরিকদের অননুমোদিতভাবে অবকাঠামো কিংবা গবাদিপশুর বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার আগে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে পূর্বে পাঠানো নোট ভারবালে উত্থাপিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান ও সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসআরএফ-সংক্রান্ত সব নির্মাণকাজ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।

চার দিনের এই সম্মেলনে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, রোহিঙ্গা সংকট, জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান, সীমান্তবর্তী নদীর পানি ব্যবহার, তীর সংরক্ষণ, অননুমোদিত নির্মাণ এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ সীমান্তে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর আওতায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

Advertisement

Link copied!