শিশু নন্দিনী হত্যা ঘিরে উত্তাল আদিতমারী, অভিযানের পর পুরুষশূন্য ফলিমারী গ্রাম

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২৬, ১১:০০ পিএম

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে সাত বছরের শিশু নন্দিনী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ঘিরে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ, প্রশাসনের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশি অভিযান ও সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের ভয়ে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ অতিউৎসাহী হয়ে প্রশাসনের কাজে বাধা দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। অভিযুক্তকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, প্রশাসনের যানবাহনে হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘটনার পর থেকেই গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল নন্দিনী। পরিবারের সদস্যরা ও স্থানীয়রা রাতভর খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরদিন সকালে অনুসন্ধান চালানোর সময় বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে সন্দেহ হয় তাদের। পরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার আগের সন্ধ্যায় স্থানীয় যুবক বিধান চন্দ্রকে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে বের হতে দেখেছিলেন এক ব্যক্তি। মরদেহ উদ্ধারের সময় তাকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। এ কারণে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে তার দিকে। ক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে আত্মগোপনে থাকা বিধান চন্দ্রকে আটক করে। পরে পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

তবে অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে না দিয়ে স্থানীয়ভাবে বিচার করার দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে যান লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান। কিন্তু তিনিসহ ঘটনাস্থলে থাকা ক্রাইমসিন ইউনিটও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু তাদেরও বাধার মুখে পড়তে হয়। একপর্যায়ে পুরো গ্রামজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক, বিজিবি-১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারাও প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন বলে জানা গেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার পক্ষ থেকে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে।

শেষ পর্যন্ত সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা হয় এবং অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় প্রশাসন। এ সময় প্রশাসনের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের অন্তত আটটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকাসক্ত বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে এবং মরদেহ বস্তাবন্দি করে মাটিচাপা দেয়। গ্রেপ্তার এড়াতে সে নিজের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিল বলেও দাবি করেন তারা।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং একাধিক সরকারি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় পৃথক মামলা করা হবে।

জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে ভেলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সংস্থা (বাইসস)-এর লালমনিরহাট জেলা আহ্বায়ক মো. আব্দুল করিম বলেন, বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে কিছু মানুষ এখনও বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন।

আদিতমারী থানার পুলিশ পরিদর্শক তাজরুল ইসলাম সর্দার জানান, বর্তমানে ফলিমারী এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ভাঙচুর ও প্রশাসনের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন।

Link copied!