গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌর এলাকায় টানা বর্ষণের পর সৃষ্ট জলাবদ্ধতা বুধবার সকাল পর্যন্তও নিরসন হয়নি। মঙ্গলবার ও বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মঙ্গলবারের তুলনায় পানির উচ্চতা কিছুটা কমলেও জলাবদ্ধতার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় এখনও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। ফলে পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো পরিবার।
বিশ্বাসপাড়া, হরিনহাটি, মোল্লাপাড়া, কালামপুর, পল্লী বিদ্যুৎ ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত সাধারণ মানুষদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। অথচ বছর পর বছর একই সমস্যা চললেও কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহু বাড়ির নিচতলা এখনও পানির নিচে। ড্রেনের ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঘরে প্রবেশ করায় নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
এদিকে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রবেশ করায় অন্তত ১৫টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শ্রমিক ও শিল্প উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাস্তব চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল ও অকার্যকর। অধিকাংশ ড্রেন বছরের পর বছর পরিষ্কার না করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি খাল, জলাধার ও পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ দখল হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিশ্বাসপাড়া ও হরিনহাটি এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য থাকা দুটি প্রধান ড্রেনের শেষ অংশে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ও ড্রেন সংকুচিত হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, "প্রতি বছর একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। কর ও পৌরকর নিয়মিত পরিশোধ করলেও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। জলাবদ্ধতা এখন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরিকল্পনাহীন নগর ব্যবস্থাপনার নগ্ন উদাহরণ।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে কালিয়াকৈর পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক তৎপরতা দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই হাজারো মানুষকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। নাগরিকদের প্রশ্ন, একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি বছরের পর বছর চললেও কেন টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কালিয়াকৈরের জলাবদ্ধতা সংকট আগামী দিনে আরও বড় জনদুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
আপনার মতামত লিখুন :