হজে অনিয়মের অভিযোগ, কোরবানির টাকা আত্মসাৎ

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

হজ শেষে দেশে ফিরেও স্বস্তি পাচ্ছেন না অনেক বাংলাদেশি হাজি। বরং তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। অভিযোগ উঠেছে, কোরবানির জন্য টাকা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই কোরবানি আদৌ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সিগুলো। পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুল তথ্য দিয়ে নিবন্ধন এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম খান সম্প্রতি স্ত্রীকে নিয়ে হজ পালন করে দেশে ফিরেছেন। চাকরির পেনশনের টাকা ও দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ব্যয় করে তিনি হজে গেলেও ফিরে এসে মানসিক অস্বস্তিতে ভুগছেন। তার অভিযোগ, যে এজেন্সির মাধ্যমে তিনি হজে গিয়েছিলেন, তারা কোরবানির টাকা নিলেও কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এজেন্সি তাদের জানিয়েছিল কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে এবং এরপর তারা হজের পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। কিন্তু পরে সৌদি সরকারের ডিজিটাল সিস্টেমে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে তাদের নামে কোরবানির কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি নিয়ে এজেন্সির কাছে জানতে চাইলেও তারা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চলতি বছর থেকে সৌদি সরকার নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি কার্যক্রম পরিচালনা বাধ্যতামূলক করেছে। কোরবানি সম্পন্ন হলে তার তথ্যও সেখানে সংযুক্ত থাকার কথা, যাতে হাজিরা সহজেই তা যাচাই করতে পারেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারও আগে থেকেই নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু অনেক এজেন্সি সেই নির্দেশনা অনুসরণ না করায় হাজিদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

হাজিদের অভিযোগ, অন্য দেশের হজযাত্রীরা নুসুক অ্যাপে কোরবানির বিস্তারিত তথ্য দেখতে পেলেও বাংলাদেশি অনেক হাজি সেই সুবিধা পাননি। ফলে কোরবানি আদৌ হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে হজের ধরন পরিবর্তন করে নিবন্ধনের বিষয়ে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী তামাত্তু ও কিরান হজে কোরবানি বাধ্যতামূলক হলেও ইফরাদ হজে কোরবানি আবশ্যক নয়। অনেক হাজির দাবি, তারা তামাত্তু হজের জন্য অর্থ দিলেও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের ইফরাদ হাজি হিসেবে নিবন্ধন করা হয়েছে। এতে কোরবানির টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চিকিৎসক সানজিদুল আলম জানান, তাদের কাফেলার অধিকাংশ সদস্য তামাত্তু হজ করলেও নথিপত্রে অনেককে ইফরাদ হাজি হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন হজযাত্রী।

কিছু ক্ষেত্রে হজযাত্রীদের এজেন্সির কর্মী বা গাইড হিসেবে দেখানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা আরাফাত রহমান বলেন, পরে তালিকায় দেখা যায় যে কিছু হাজিকে কর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে এজেন্সি এটিকে ভুল বোঝাবুঝি বলে ব্যাখ্যা দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক হাজির কাছ থেকে কোরবানির অর্থ ছাড়াও ‘ভুলের দম’ বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী হজের সময় কোনো ভুল হলে পরবর্তীতে দম দিতে হয়। কিন্তু অনেক এজেন্সি হজের আগেই সেই অর্থ আদায় করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হজ শেষে দেশে ফেরা একেএম আহসানুজ্জামান বলেন, তার পরিবারের চার সদস্যের প্রত্যেকের কাছ থেকেই একাধিক কোরবানির সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে। অথচ কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার কোনো লিখিত বা ডিজিটাল প্রমাণ তারা পাননি।

বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন হাজি মক্কায় অবস্থানকালে বাংলাদেশ হজ অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর প্রতিনিধিদের ডেকে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে এজেন্সির পক্ষ থেকে অভিযোগের সন্তোষজনক জবাব দেওয়া সম্ভব হয়নি।

দেশে ফেরার পর কিছু এজেন্সি অতিরিক্ত নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন হাজির দাবি, অভিযোগ প্রত্যাহারের শর্তে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অভিযোগের মুখে থাকা আল মূলতাজিম হজ কাফেলা ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরসের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমদ বলেন, তারা কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি এবং অধিকাংশ হাজির কোরবানির টাকা যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যাদের কোরবানি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কেউ কেউ ইফরাদ হজ করেছেন অথবা এজেন্সির সঙ্গে কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তবে হজের আগেই দমের টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলসের কর্ণধার আব্দুর রহমান দাবি করেন, কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষকে তা দেওয়া হবে। নুসুক অ্যাপে তথ্য না থাকার কারণ হিসেবে তিনি নতুন নিয়ম ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আয়াতুল ইসলাম জানিয়েছেন, কোনো হাজি অনিয়ম বা প্রতারণার শিকার হয়ে থাকলে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, কোন হাজি কোন ধরনের হজ পালন করেছেন বা কারা কোরবানির অর্থ জমা দিয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৮ হাজার ৬০০ জন হজ পালন করতে সৌদি আরব গেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজারই গেছেন বেসরকারি হজ এজেন্সির মাধ্যমে। কিন্তু কোরবানির অর্থ দেওয়া হাজিদের সবার কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য না থাকায় উদ্বেগ ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Link copied!