মিয়ানমারে সামরিক সরকারের ঘোষিত নির্বাচনকে ঘিরে গত ছয় মাসে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর জান্তা সরকার যে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়, সেই প্রক্রিয়াকে ঘিরেই এই সহিংসতা বেড়ে ওঠে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাইরে রেখে আয়োজিত এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং অনেকেই একে গণতন্ত্রের পরিপন্থী উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সামরিক বাহিনীর নির্বিচার আকাশ হামলা। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জান্তা বাহিনী ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সাগাইং অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে আকাশ হামলায় অন্তত ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সাগাইংয়ে সংঘটিত দুটি বড় হামলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে চাউং-ইউ এলাকায় ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সমবেত মানুষের ওপর আকাশ হামলা চালানো হলে চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হন। পরে ডিসেম্বর মাসে তাবায়িন এলাকার একটি চায়ের দোকানে ফুটবল খেলা দেখার সময় চালানো বোমা হামলায় অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু ঘটে।
প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গারা একদিকে হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক এবং যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের জোরপূর্বক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শাসনের কারণে মিয়ানমারের জনগণ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতির কারণে তাদের সংকট আরও গভীর হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশটির লাখো মানুষের জীবন অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাটছে।
এদিকে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলকারী সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে সামরিক সরকার।
আপনার মতামত লিখুন :