গাজীপুরে লোডশেডিংয়ের নৈরাজ্য! জনজীবন বিপর্যস্ত, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ

আখতার হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। দিনে-রাতে দফায় দফায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি ও আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

নগরীর টঙ্গী, গাজীপুর সদর, জয়দেবপুর, শিববাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, গাছা, পূবাইল, টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিমসহ বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কোথাও এক ঘণ্টা, কোথাও দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ থাকছে। শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় অনেক স্থানে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বিভিন্ন সময়ে চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সন্ধ্যার পর এমনকি গভীর রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরমে বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও ভোগান্তি বাড়ছে।

টঙ্গীর এক ব্যবসায়ী বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকানের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিনির্ভর ব্যবসায় লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলেন, সামনে পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পড়াশোনা করা যাচ্ছে না। গরমে ঘরে বসে পড়াশোনা করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে শিল্পনগরী গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

এদিকে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, "সারাদেশের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রী পদত্যাগ করে ইতিহাস রচনা করতে পারেন! এই সুযোগ হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।" আরেকজন মন্তব্য করেন, "বিদ্যুতের বিল নিয়মিত বাড়ে, কিন্তু সেবার মান কমছে। জনগণ বিল দেবে, আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারেও থাকবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না।" অন্যজন লেখেন, "গরমে মানুষ অতিষ্ঠ, তার ওপর লোডশেডিং। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।" অন্য একজন মন্তব্য করেন, "শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে এমন বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।"

এ ছাড়া কয়েকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী সাবেক সরকারের বিদ্যুৎনীতি নিয়েও সমালোচনা করেছেন। তাদের কেউ কেউ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির নীতিকে বর্তমান সংকটের পেছনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এসব মন্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব মতামত; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাধারণ নাগরিকদের দাবি, শিল্পনগরী গাজীপুরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।

Advertisement

Link copied!