ইটনায় উজ্জ্বল হত্যা: আদালতের নির্দেশে ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা, এসআইয়ের অডিও ফাঁসে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

রেজাউল করিম রেজা, ঢাকা/জামাল উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের ইটনায় জমি-সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত বিএনপি নেতা উজ্জ্বল মিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, থানা পুলিশ প্রথমে মামলা গ্রহণ না করায় তারা আদালতের শরণাপন্ন হন। পরে আদালতের নির্দেশে ইটনা থানায় হত্যা মামলাটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

​​মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২ জুন ২০২৬ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ইটনা উপজেলার পাথারকান্দি এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হন উজ্জ্বল মিয়া। ঘটনার দিন আসামিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে (রামদা, লোহার রড, শাবল, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি) সজ্জিত হয়ে পাথারকান্দি পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের সামনে অবস্থান নেয়। পরে জরুরি কথা বলার কথা বলে উজ্জ্বল মিয়াকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে ১ নম্বর আসামির হুকুমে ২ নম্বর আসামি সিবলু মিয়া হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে তার বুকের মাঝখানে সজোরে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। তারপর সকল আসামিগন এলোপাতাড়ি পিটিয়েছে। 

​একই সঙ্গে ৩ নম্বর আসামি খাইরুল তার হাতে থাকা শাবল দিয়ে এবং ১০ নম্বর আসামি জিয়ন লোহার রড দিয়ে উজ্জ্বল মিয়ার পিঠের বাম পাশে ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে মারাত্মক জখম করে। উজ্জ্বল মিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়লে অন্যান্য আসামিরাও বাঁশের লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর নীলাফুলা জখম করে।

​গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জুন ২০২৬ রাত আনুমানিক ৩টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

​হামলার পর অভিযুক্তরা ক্ষান্ত না হয়ে উজ্জ্বল মিয়ার বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও কোপাকুপি চালিয়ে প্রায় ২,০০,০০০/- (দুই লাখ) টাকার ক্ষয়ক্ষতি করে এবং এই নিয়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমা করলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। নিহতের দাফনকাজ সম্পন্ন করা এবং প্রাথমিকভাবে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা গ্রহণ না করায় পরবর্তীতে আত্মীয়স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের শরণাপন্ন হয়।

​নিহতের ভাগিনা মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। নিহতের স্ত্রী মোছা: নাদিরা আক্তার জানিয়েছেন, ঘটনার পর প্রায় ১৫ দিন ইটনা থানা মামলা গ্রহণ না করে টালবাহানা করেছে। পরবর্তীতে আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ইটনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন (পিটিশন নং-২৬৭/২৬)।

নিহত উজ্জ্বলের দুই কন্যা—মোছা. রিয়া মনি (১২) ও মোছা. প্রেমা মনি (৮)—বাবার মৃত্যুর শোকে ভেঙে পড়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “আমাদের আর কেউ রইল না। যারা আমাদের বাবাকে হত্যা করেছে, আমরা তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি, ফাঁসি চাই।”

​মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। তারা সবাই ইটনা উপজেলার পাথারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। আসামিরা হলেন:

১. মোঃ রফিকুল ইসলাম, ২. সিবলু মিয়া (সিবেল মিয়া), ৩. খাইরুল ইসলাম, ৪. সারজুল মিয়া, ৫. আলী মিয়া, ৬. ওয়াব মিয়া, ৭. হাহদুল মিয়া, ৮. তাজুল ইসলাম, ৯. মিজাজুল, ১০. জিয়ন মিয়া, ১১. রেকুল মিয়া, ১২. সারোয়ার, ১৩. মোঃ সাদী, ১৪. আবু কালাম, ১৫. মেনু মিয়া, ১৬. জামাতুল, ১৭. হেলিম মিয়া, ১৮. বাবুল মিয়া এবং ১৯. ইয়াছিন।

​এজাহারে অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এর আগেও একটি মামলা হয়েছিল (মামলা নং- ২(৬)২০২৬)। ওই মামলার পর থেকেই উজ্জ্বল মিয়াকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন প্রতিপক্ষের লোকজন।

​সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, উজ্জ্বল মিয়ার পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ১৯৮২ সালে নিহতের চাচাতো ভাই হামিদকে এবং ১৯৯১ সালে তার চাচা ইসরাইলকে প্রতিপক্ষ ও তাদের পূর্বপুরুষেরা খুন করে। পূর্বের হত্যাকাণ্ডগুলোর সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় নতুন করে ২০২৬ সালে এসে উজ্জ্বল মিয়াকে আবারও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

​সৈয়ব আলী জানান, আসামি পক্ষ ও তাদের আত্মীয়-স্বজন ইতিপূর্বে দুটি হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে নিজেরা নিজেদের  হক মিয়া নামের এক  ব্যক্তিকে হত্যা করে উজ্জ্বলের আত্মীয়-স্বজনকে আসামি করেছিল। পরবর্তীতে সিআইডির তদন্তে আসল ঘটনা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, উজ্জ্বল হত্যাকাণ্ডের খুনিদের এই নাটক দীর্ঘদিনের।  স্থানীয় কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, মামলার কিছু আসামির সঙ্গে থানার সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া সাবেক ওসি মোহাম্মদ সোয়েব খানের  ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ​

এ বিষয়ে ইটনা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোয়েব খান বলেন, “উজ্জ্বলের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদনে তার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।”

আসামিপক্ষের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “আমি কোনো ঘুষ নিইনি। এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। ঘুষ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

​স্থানীয়দের তথ্যমতে, উজ্জ্বল হত্যাকাণ্ডের আসামিদের সঙ্গে ইটনা থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই সজিবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেপ্তার না করে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় বসেন এবং বাদীপক্ষকে কীভাবে হয়রানি করা যায়, সে বিষয়ে মূল ভূমিকা পালন করছেন। প্রতিদিনের কাগজের হাতে এসআই সজিবের একটি অডিও এসেছে, যেখানে তাকে উজ্জ্বল হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার না করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ রয়েছে বলে দাবি করতে শোনা যায়। অডিওতে তিনি বারবার বলেন যে, মামলার আসামি গ্রেপ্তার করা যাবে না, এটা উপরের নির্দেশ। তবে কার নির্দেশ, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

​এই বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই সজিব বলেন, ঘটনাটি আসলে হত্যাকাণ্ড কি না, সে বিষয়ে তার সন্দেহ ছিল। তাই তিনি আসামি গ্রেপ্তার করেননি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে দাবি করেন।

​ইটনা থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোশাররফ হোসেন বলেন, "পূর্বে উজ্জলের দায়ের করা  মারামারির মামলায় আবু কালাম ও জিয়নকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। তারা দুজনকে ৮ জুলাই আদালতের মাধ্যমে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।"

​ইটনা থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুল্লাহ খান জানান, "আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে বক্তব্য (এসআই সজিবের অডিও প্রসঙ্গে) দিতে পারেন না। আমি আসামি গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অন্য মামলায় কারাগারে থাকা দুই আসামিকে আগামীকাল এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।"

​কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, "উজ্জ্বল হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রকৃত দোষীদের তদন্তপূর্বক গ্রেপ্তার করা হবে, যেন নিরীহ কোনো ব্যক্তি হয়রানির শিকার বা ফেঁসে না যান।"

​এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।

Advertisement

Link copied!