অবসর আতঙ্কে পুলিশ প্রশাসন, তালিকায় অন্তত ১৭৪ কর্মকর্তা

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

নির্ধারিত সময়ের আগেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তে পুলিশ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, এ পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য সামনে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে পুরো পুলিশ প্রশাসনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী ও বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক’, ‘তথ্য ফাঁস’ এবং ‘রাজনৈতিক তৎপরতায় জড়িত থাকার’ অভিযোগ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে অন্তত ১৭৪ জন কর্মকর্তার একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

 

তালিকায় ১৫, ১৭, ১৮ ও ২০ ব্যাচের প্রায় ৫৭ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ২০ ব্যাচের কর্মকর্তাই রয়েছেন ৫৩ জন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত বহু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), যারা পরে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হয়েছেন, তারাও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, যেসব কর্মকর্তার সরকারি চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

সূত্রের দাবি, তালিকায় ২০ ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তার পাশাপাশি ১৫ ব্যাচের দায়িত্বে থাকা দুই অতিরিক্ত আইজিপি রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে আবাসন ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ১৭ ও ১৮ ব্যাচের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নামও তালিকায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

 

একইভাবে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অন্তত ১১৭ জন সাবেক ওসিকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে বিভিন্ন স্থানে এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধেও সরকারবিরোধী গোপন তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

 

তবে পুলিশের ভেতরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, তারা তৎকালীন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্দেশ অমান্য করলে তখন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে শাস্তির মুখে পড়তে হতো। তাদের ভাষ্য, চাকরি রক্ষার স্বার্থেই তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তালিকায় এমন অনেক মেধাবী কর্মকর্তাও রয়েছেন, যারা যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, সরকারি চাকরিবিধিতে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান রয়েছে। তাই এটি আইনি কাঠামোর বাইরে নয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেককে অবসরে পাঠানো হলেও অভিযোগের ধরন বা সময়কাল সবসময় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

 

তার মতে, অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো অনেক কর্মকর্তা পরে আদালতের মাধ্যমে চাকরি ফিরে পেয়েছেন, কারণ সে সময়ের কিছু সিদ্ধান্তে আইনগত ত্রুটি ছিল।

 

এর আগে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, যাদের মধ্যে ১৬ জন ছিলেন ডিআইজি। এরও আগে ২২ এপ্রিল আরও ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এবং ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নয়জন কর্মকর্তাকে একইভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

 

গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ও সংযুক্ত অবস্থায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক, তথ্য ফাঁস এবং রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। এসব তথ্য পাওয়ার পর সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে যেসব কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

 

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার জনস্বার্থে তাকে যেকোনো সময় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন হয় না।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, গত দেড় বছরে চাকরিবিধি অনুযায়ী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও কয়েকজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিগত সরকারের সময় কিছু পুলিশ কর্মকর্তা অতিউৎসাহী হয়ে নানা অনিয়ম ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিরীহ মানুষের ওপর হামলা ও গুলি চালানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া গুম ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগেও কয়েকজনের নাম এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর কেউ পালিয়ে গেছেন, কেউ সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন এবং কেউ সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। এ অবস্থাতেও তাদের বিরুদ্ধে সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার তদন্তও চলছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে চার্জশিট দাখিল হলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফল। তার মতে, স্বাধীনতার পর থেকেই এ প্রবণতা থাকলেও শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারাচ্ছেন। তবে সরকারের উচিত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে কোনো দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

Advertisement

Link copied!