ঢাকায় বহুতল ভবন, গ্রামে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সাবেক একান্ত সচিব (পিএস) মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় এসব সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে ক্রয় করা হয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর পল্লবী সেকশন-৬-এর ৮ নম্বর সড়কের সি-ব্লকের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ১ হাজার ১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে আহম্মদুল্লাহর। এছাড়া আদাবরে একটি প্লট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট এবং কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে তার স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে সাড়ে তিন কাঠা জমির ওপর আটতলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।

দলিল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে প্লটটি ক্রয় করা হয়। দলিলে জমির মূল্য ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান বাজারমূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। নুসরাত জেবিন সিনথী জমি ও ভবনের মালিকানা স্বীকার করে জানান, ভবন নির্মাণে তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন।

এছাড়া আদাবরের একটি প্লট প্রথমে আহম্মদুল্লাহ তার শ্বশুর অলিউল হকের নামে কিনে পরে সেটি স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে তিনি একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ওই এলাকায় তার ১০ একরেরও বেশি জমি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়া বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর কলেজসংলগ্ন এলাকায় জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী ব্যক্তিগত গাড়িতে সরকারি লোগো ব্যবহার করতেন। ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩-৪৭৬৯ নম্বরের ওই গাড়িটি ব্যক্তিগত হলেও সামনে সরকারি প্রতীক ব্যবহার করা হতো। অন্যদিকে আহম্মদুল্লাহ নিজেও দীর্ঘদিন বিপিসি চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, প্রতি মাসে পল্লবীর বাসভবনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গাড়িভর্তি উপহারসামগ্রী নিয়ে আসতেন। বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিপিসির অধীনস্থ আটটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয় ও প্রশাসনিক ফাইল চেয়ারম্যানের অনুমোদনের আগে আহম্মদুল্লাহর মাধ্যমে যেত।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করতেন।

এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী (বাংকার) ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শত শত কোটি টাকার বিল দ্রুত অনুমোদনের বিনিময়েও তিনি আর্থিক সুবিধা নিতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিটুমিন বিতরণ, বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্ট এবং ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের ফাইলেও অর্থ লেনদেন ছাড়া ফাইল চেয়ারম্যানের টেবিলে না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে একটি ফিলিং স্টেশনের অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

আহম্মদুল্লাহ ২০১৯ সালে বিপিসিতে সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির আবেদনে তিনি নিজের স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন।

বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি নবম গ্রেডের হলেও তিনি ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও টানা সাড়ে ছয় বছর ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

এ সময় বরিশাল অঞ্চলের লোকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিপিসির ঢাকা কার্যালয় ও রেস্ট হাউসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বরিশাল অঞ্চলের লোকজনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

২০২১ সালে বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ আহম্মদুল্লাহকে চট্টগ্রামে বদলির আদেশ দেন। তবে মাত্র একদিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিল হয় এবং তিনি পুনরায় পিএস হিসেবে দায়িত্বে ফিরে আসেন।

এদিকে তার অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গত ১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব স্থানান্তরের অভিযোগ তোলেন।

অভিযোগে বলা হয়, তার দায়িত্বকালে বিপিসির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়। এছাড়া ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসোহারা আদায়, তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতি এবং ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

বিপিসির উপব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. ইসতিয়াক হোসেন স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্রে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন, টিএ/ডিএ ও জ্বালানি বিল বাবদ আহম্মদুল্লাহকে ৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

Advertisement

Link copied!