কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফাটল, ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ১১:২২ পিএম

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বাস্তবায়নাধীন অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়েও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীকে জোয়ারের পানি ও বন্যার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ, একাধিকবার ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি এবং নির্মাণমান নিয়ে বিতর্কের কারণে প্রকল্পটি এখন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বাঁধ-কাম-সড়কের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। খালের মুখে নির্মিত রেগুলেটরের বিমে ফাটল দেখা গেছে। এছাড়া পানি প্রতিরোধে ব্যবহৃত কয়েকটি কংক্রিট ব্লকেও ক্ষতির চিহ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে মানসম্মত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভরাট কাজে পুরোনো ভবনের ভাঙা ইট, রাবিশ, পলেস্তরা ও নিম্নমানের মাটি ব্যবহার করায় প্রকল্পের স্থায়িত্ব ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেক সভায় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্ভব হয়নি। পরে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে প্রথমে ২০২৪ সালের জুন, এরপর ২০২৫ সালের জুন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা বেশি।

এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যথাযথ পরিকল্পনা ও তদারকি থাকলে কেন বারবার সময় ও ব্যয় বাড়াতে হলো? যদিও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জমি অধিগ্রহণ ও বাস্তবায়নজনিত জটিলতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতিই প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ।

অভিযোগের কেন্দ্রে প্রকল্প পরিচালক

প্রকল্পটির সার্বিক তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী রাজিব দাশ। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্নমানের কাজকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী রাজিব দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “আপনি নিউজ করেন, এই পর্যন্ত নিউজ করে কেউ আমার কিছু করতে পারেনি। তাই আপনার ইচ্ছা হলে আপনার মতো নিউজ করেন। এতে আমার কোনো ক্ষতি নেই।”অভিযোগ রয়েছে, বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি প্রতিবেদকের নম্বর হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক করে দেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের মতো উপকূলীয় ও জোয়ারপ্রবণ এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের নির্মাণমানের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। এ ধরনের অবকাঠামো দুর্বল হলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, ভবিষ্যতে নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণও হতে পারে।

প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফাটল ও ক্ষয়ের অভিযোগ সামনে আসায় এখন প্রশ্ন উঠেছে— হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প আদৌ নগরবাসীকে প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে পারবে, নাকি নির্মাণ অনিয়ম ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট সৃষ্টি করবে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের নির্মাণমান, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

Advertisement

Link copied!