প্রমত্ত পদ্মার পুনরাবৃত্তি: বাংলাদেশের বিপ্লব কেন বারবার নস্যাৎ হয়? : ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান , লেখক

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না, আবার সম্পূর্ণ চক্রাকারেও ঘোরে না—এটি বরং এক সর্পিল গতিপথ, যেখানে প্রতিটি বাঁক পূর্ববর্তী বাঁকের স্মৃতি বহন করে চলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছিল এমনই এক বিরল সন্ধিক্ষণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া গণ-অভ্যুত্থান একটি দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটায়। এই গণজাগরণ কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর গভীরে লুকিয়ে ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আরও গভীর একটি সামাজিক চুক্তির স্বপ্ন। প্রশ্ন হলো, এই আকাঙ্ক্ষা কি পূর্ণতা পাবে, নাকি ১৯৭১-পরবর্তী অন্যান্য গণআন্দোলনের মতো এটিও ধীরে ধীরে নিভে যাবে? বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো কেন বারবার নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেও পুরোনো ক্ষমতার বলয়ে ফিরে যায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের গভীরে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দিকে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু পুরনো সংকটের দিকে।

আকাঙ্ক্ষার তিনটি অধ্যায়

১৯৭১: স্বাধীনতার স্বপ্ন ও অসমাপ্ত যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু ভূখণ্ড স্বাধীন করার লড়াই নয়, ছিল মানুষের মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম। পাকিস্তান আমলে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও শোষণের বিপরীতে জনগণের প্রধান চাওয়া ছিল একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর সংবিধানে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের মূলনীতি গৃহীত হলেও, কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা রাষ্ট্রকে গ্রাস করে। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড ও সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা বাধাগ্রস্ত হয়।

১৯৯০: স্বৈরাচার পতন ও নতুন আশা। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ আবার প্রশ্ন তোলে—ভোটের অধিকার ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে। তিন জোটের রূপরেখার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও, নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়নি। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় সংঘাত ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বারবার, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটেনি—এটাই ১৯৯০-পরবর্তী তিন দশকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

২০২৪: নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের রূপ নেয়। তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা চেয়েছে। ২৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পায়, আর ৫ আগস্ট দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল তিনটি মৌলিক চাওয়া: প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন গঠন, এবং পুরোনো দ্বিমেরু রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারার উত্থান।

বিপ্লব কেন বারবার নস্যাৎ হয়?

বাংলাদেশের আন্দোলনগুলো কেন চূড়ান্ত সফলতা পায় না, বা সফল হলেও কেন পুরোনো কাঠামোতেই ফিরে যায়—এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।

এক, নির্মাণের চেয়ে বিরোধিতার রাজনীতি। বাংলাদেশের গণআন্দোলনগুলো প্রতিরোধে শক্তিশালী, কিন্তু বিকল্প নির্মাণে দুর্বল। জনতা জানে সে কী চায় না, কিন্তু ক্ষমতা পতনের পর কী ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো টেকসই হবে তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা আগে থেকে তৈরি থাকে না। ফলে ক্ষমতার শূন্যস্থান দ্রুত পুরোনো রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র পূরণ করে ফেলে, আর সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের চরিত্র অপরিবর্তিত থেকে যায়।

দুই, সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব। প্রতিটি সফল আন্দোলনের ফসল শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলে পুরোনো রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের সুফল ভোগ করেছে পুরোনো দলগুলোই, যারা পরে একই ত্রুটিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে। ২০২৪-পরবর্তী সময়েও রাজনীতির মধ্যপ্রান্তর দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে পুরোনো রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি—যা বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাকে ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ছকে বেঁধে ফেলে।

তিন, অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ভৌগোলিকভাবে ঢাকাকেন্দ্রিক ও পারিবারিক-গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। যেহেতু আন্দোলনগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক, তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সরাসরি সুফল দেখতে পায় না। সরকার পতনের পরও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পুরোনো ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা থেকে যায়, ফলে কাঠামোগত সংস্কারের হাতিয়ার সীমিত হয়ে পড়ে।

চার, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও স্থিতিশীলতার চাপ। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান একে একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে পরিণত করেছে, যেখানে প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায়ই কাঠামোগত সংস্কারের চেয়ে দ্রুত স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারগুলোকে গভীর সংস্কারের বদলে পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে আপসের দিকে ঠেলে দেয়।

পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বনাম কাঠামোগত জড়তা

এই কারণগুলো মিলিয়ে একটি দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা তৈরি করে। একদিকে তরুণ সমাজের মধ্যে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের জন্য গভীর তাগিদ কাজ করে; অন্যদিকে রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জড়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিণত সংস্কৃতি মিলে একটি প্রতিরোধী বলয় তৈরি করে। ২০২৪ সালের আগস্টে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সেই বলয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলেও নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো বড় পরিসরে অপরিবর্তিত থাকায় রূপান্তরের গতি মন্থর হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে বিপ্লব সাধারণত সশস্ত্র বা দীর্ঘমেয়াদি সংগঠিত আন্দোলনের ধ্রুপদি রূপ নেয় না; বরং তা আসে আকস্মিক গণজাগরণের রূপে। কিন্তু এই তীব্র জাগরণ থিতিয়ে এলে দেখা যায়, শাসনক্ষমতার মুখ বদলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বহুলাংশে অটুট রয়ে গেছে। এই কাঠামোগত অপরিবর্তনীয়তাই বাংলাদেশের বারবার আন্দোলনকে ইতিহাসে ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত করে তোলে।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথ

ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের সামনে মূলত দুটি সম্ভাবনা দেখা যায়। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনে প্রকৃত কাঠামোগত সংস্কার করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, যদি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের পুরোনো প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে—বিশেষত এমন এক প্রজন্মের সামনে, যারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন এবং প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নে—দেশ কি কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন দেখবে, নাকি প্রকৃত অর্থে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে? ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে রাখা যায় না। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের স্থিতিশীলতা পায়, যখন নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়—কেবল ক্ষমতার হাতবদলের মধ্য দিয়ে নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও কাঠামোগত বাস্তবতার মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের বিবরণ। ১৯৭১ সালে মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রের আশা করেছিল, আর ২০২৪ সালে নতুন প্রজন্ম ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি তুলেছে। প্রতিটি পরিবর্তনের পরই দেখা গেছে, কেবল ক্ষমতার হাতবদল জনগণের স্বপ্ন পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর রূপান্তর। প্রতিটি ব্যর্থ বা অসম্পূর্ণ আন্দোলনও কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যায় না; তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চেতনার জন্য অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার পুঁজি জমা করে রাখে। বিপ্লব কোনো একক ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—আর সেই প্রক্রিয়াকে ধরে রাখার মতো ধৈর্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

(লেখক-জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)।

Advertisement

Link copied!