রাতের ভোটের অভিযোগে আলোচনায় দুই সাবেক ডিসি, তদন্তে বিপুল সম্পদের তথ্য

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

পর্যটনের জনপ্রিয় গন্তব্য সেন্টমার্টিনে রিসোর্ট, রাজধানীর বঙ্গবাজারে দুই ডজন দোকান, গুলশান, মগবাজার ও মিরপুরের অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।

মাত্র প্রায় ৯০ হাজার টাকা বেতনের সরকারি চাকরি করেও এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি, কর ফাঁকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিশেষায়িত আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কথিত ‘রাতের ভোট’ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগে তৎকালীন পিরোজপুর ও বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, কর ফাঁকি ও অর্থপাচারের তথ্য মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত এসব কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া এবং বিনিময়ে বিপুল অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের অনেককে ওএসডি করা হলেও, অভিযোগ রয়েছে—বর্তমানে কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা করছেন।

সাবেক ডিসি সাজ্জাদ হোসেনের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধান অনুযায়ী, পিরোজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকায় ১ হাজার ৭১০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মালিক। আয়কর নথিতে ফ্ল্যাটটির মূল্য দেখানো হয়েছে ৫৪ লাখ টাকা।

কিন্তু কর গোয়েন্দাদের তদন্তে জানা যায়, একই ফ্ল্যাটের জন্য তিনি ডেভেলপার কোম্পানিকে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। অর্থাৎ সম্পদের মূল্য প্রায় ৫৯ লাখ টাকা কম দেখিয়ে কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।

এছাড়া যশোরে উত্তরাধিকারসূত্রে চারটি ফ্ল্যাট পাওয়ার দাবি করলেও তদন্তে উঠে এসেছে, তার পিতা ২০১৩ সালে মারা যান এবং জীবদ্দশায় ওই স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেননি। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব ফ্ল্যাট নিজের অর্থে নির্মাণ করলেও সেগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বলে দেখানো হয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্যে চারটি ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।

স্ত্রীর নামে গুলশানে দুই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী রিজিয়া সুলতানার নামে রাজধানীর গুলশানে লেক-সংলগ্ন দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। একটি ২,২৯২ এবং অন্যটি ২,৫৬৭ বর্গফুট আয়তনের। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুটের গড় মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা হিসেবে দুটি ফ্ল্যাটের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক অজিয়র রহমানের বিরুদ্ধেও বিপুল সম্পদ গোপন ও কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।

তার আয়কর নথিতে রাজধানীর মগবাজারের ওয়েসিস প্রজেক্টে ২ হাজার ৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৯৩ লাখ টাকা উল্লেখ করা হলেও তদন্তে জানা যায়, ফ্ল্যাটটির জন্য তিনি ডেভেলপারকে নগদ ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং প্রকৃত ক্রয়মূল্য ছিল ২ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ফলে এক ফ্ল্যাটেই প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অজিয়র রহমানের নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে রাজধানীর বঙ্গবাজারে অন্তত ২০টি দোকান রয়েছে। প্রতিটির গড় মূল্য ৩০ লাখ টাকা ধরে মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সেন্টমার্টিনে ‘সীমানা পেরিয়ে’ নামে একটি রিসোর্ট রয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। ১৪টি কক্ষ ও একটি রেস্টুরেন্টসমৃদ্ধ ওই রিসোর্ট নির্মাণে ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, ‘আব্দুর রশিদ ফাউন্ডেশন’ নামে তার পিতার নামে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, অর্থের উৎস ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পিরোজপুরের সাবেক ডিসি আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হলেও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

“যশোরে আমার পৈতৃক বাড়ি। ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত। আমার সব সম্পদ আয়কর নথিতে রয়েছে। কোনো কিছুই গোপন করা হয়নি। সম্পদ ও আয়ের উৎসের তথ্যও নথিভুক্ত আছে।”

তবে সম্পদের মূল্য কম দেখানো এবং স্ত্রীর নামে গুলশানের ফ্ল্যাট প্রসঙ্গে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

অন্যদিকে বরিশালের সাবেক ডিসি অজিয়র রহমান বলেন, “এ ধরনের কিছুই আমার নেই। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”

২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে এনএসআইয়ের প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। ওই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা ছিল মাত্র ২২টি আসনে। বাকি আসনগুলোতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের জয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও পুলিশের যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে নির্বাচনী দায়িত্বে কর্মকর্তাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আনুগত্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং এর ফলেই নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এসব কর্মকর্তার সম্পদ ও আয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তারা নানা কৌশলে সম্পদ ও আয়ের উৎস গোপন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য মিলেছে। এখন তাদের কাছ থেকে সরকারের প্রাপ্য কর আদায়ের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও অর্থপাচারসহ অন্যান্য অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও তদন্ত করবে।”

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,“এনবিআরের গোয়েন্দা ইউনিটের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অন্যরাও নিরুৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে সরকারের কর আদায়ও বাড়বে।”

Advertisement

Link copied!