১০২ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, বিএফআইইউর প্রতিবেদনে জেমকনের নাম

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম

রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত ১০২ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে জেমকন গ্রুপের বিরুদ্ধে বিস্তৃত তথ্য তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অনুমোদনহীন বিনিয়োগ, চা ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আড়ালে অর্থ সরিয়ে নেওয়া এবং ভুয়া রপ্তানি চালানের মাধ্যমে এই অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রুপটির বিপুল অঙ্কের ব্যাংকঋণও বর্তমানে খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিএফআইইউর হিসাবে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ অন্তত ১০২ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই পাঠানো হয়েছে ৬১ লাখ ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার, যার বাংলাদেশি মুদ্রামান প্রায় ৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৮ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান আমেনা আহমেদ এবং পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদ, কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী আনিস আহমেদ এই অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের তদন্তাধীন রয়েছে।

বিএফআইইউ জানায়, দুই হাজার চব্বিশ সালের ডিসেম্বর মাসে জমা দেওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পরিচালক কাজী আনিস আহমেদের বিদেশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত অ্যাগনেটা এলএলসি নামের একটি পাইকারি খাদ্যপণ্য ও চা বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানে তার পঁচাত্তর শতাংশ মালিকানা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই কাজী আনিস আহমেদ, কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী নাবিল আহমেদ প্রতিষ্ঠানটিতে ৬১ লাখ ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার ঋণ দেন। পরে সেই ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করে মালিকানা গ্রহণ করা হয়। বিএফআইইউ এই বিনিয়োগকে সরাসরি অর্থপাচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের টিটুলিয়া ইউকে লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানেও অনুমোদনহীন বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুই হাজার তেইশ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার আগে সেখানে আড়াই লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড বিনিয়োগ করেন কাজী আনিস আহমেদ, যার বাংলাদেশি মুদ্রামান প্রায় চার কোটি ছয় লাখ ৫৪ হাজার ৭৫০ টাকা।

এ ছাড়া দুবাইভিত্তিক ডাবল কোর জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজী আনিস আহমেদের পঁচিশ শতাংশ মালিকানার তথ্যও পেয়েছে বিএফআইইউ। সেখানে তিনি অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জেমিনি সি ফুড লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভুয়া রপ্তানি চালানের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে প্রায় ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি দেখালেও প্রায় এক বছর পর সেই পণ্য আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিএফআইইউর মতে, পচনশীল পণ্য এত দীর্ঘ সময় পর ফেরত আসা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এটি প্রকৃত রপ্তানি নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না আনার একটি কৌশল হতে পারে।

কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেডের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিএফআইইউ। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে চা রপ্তানি করলেও আটটি চালানের বিপরীতে প্রায় চার লাখ ১৩ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ পাঁচ কোটি আট লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ টাকার রপ্তানি আয় দেশে আনেনি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক একই ব্যক্তি হওয়ায় এটি পরিকল্পিত অর্থপাচারের ইঙ্গিত বহন করে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত আমদানিকারকের কাছ থেকে অর্থ না এসে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার দেশে আনা হয়েছে। বিএফআইইউর ধারণা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে রপ্তানি আয়ের হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের দৃষ্টিতে সন্দেহজনক লেনদেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেমকন গ্রুপ দেশের উনিশটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোট দুই হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। দুই হাজার চব্বিশ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এর মধ্যে এক হাজার ৭৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাংক এশিয়া থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ও সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করেছে বিএফআইইউ।

এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধ, গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসার প্রকৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেনের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি ওষুধ ও বিদ্যুৎ খাতের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে চা ব্যবসার হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বিএফআইইউর মতে, এসব কার্যক্রম মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দুই হাজার বারোর বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের মধ্যে পড়ে। বিদেশে অনুমোদন ছাড়া অর্জিত সম্পদ ও বিনিয়োগকে পাচারকৃত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন এবং ভুয়া রপ্তানির অভিযোগ নিয়ে আরও গভীর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি অপরাধ তদন্ত বিভাগের আর্থিক অপরাধ শাখা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে ইতোমধ্যে তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

মামলার তথ্যে বলা হয়েছে, কাজী আনিস আহমেদ তার আয়ের উৎসের বাইরে প্রায় ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। একই সময়ে তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৭৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধেও প্রায় ৩২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রায় ৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, অর্থপাচার ও অনুমোদনহীন বিদেশি বিনিয়োগসংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন তারা প্রয়োজনীয় তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে বিএফআইইউ তদন্তে সহযোগিতা করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বিএফআইইউর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারেন না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নেই এবং অনুমোদনবিহীন বিনিয়োগ বা অর্থপাচারের অভিযোগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী আনিস আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেমকন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন খান দাবি করেন, অভিযোগের সময় তিনি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে ছিলেন না এবং এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য, বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হবে।

Advertisement

Link copied!