সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, ব্যাপক অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী বিতর্কিত ঠিকাদার ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ বণ্টনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে সাবেক সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাইয়ের মালিকানাধীন টাঙ্গাইলের বীথি কনস্ট্রাকশনকে কাজটি দেওয়া হয়। এ নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজের অভিজ্ঞতা এবং দরপত্র মূল্যায়নের নথিপত্র জানতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী নানা অজুহাতে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে সংক্ষুব্ধ আবেদনকারী পক্ষ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, চলতি অর্থবছরে বড় বড় উন্নয়নকাজকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রায় সোয়া কোটি টাকার বরাদ্দে ৩৭টি কোটেশনভিত্তিক ক্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব কাজের বেশ কয়েকটির কোটেশন আহ্বান করে দ্রুত বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াভিত্তিক এসএ এন্টারপ্রাইজকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটিকে সোয়া কোটি টাকার একাধিক লাভজনক কাজ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপকেন্দ্র ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের প্রায় ৬৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে টাইলস, রেলিং, সিঁড়ি ও ছাদ সংস্কারের কয়েকটি পৃথক কাজ, জেলা কারাগারের আবাসিক ভবন মেরামতসহ একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বও একই প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব কাজের তদারকি নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালেও একই প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুলসংখ্যক কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে তার পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। পরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দুই হাজার তেইশ সালের নভেম্বরে সিরাজগঞ্জে যোগ দেওয়ার পর তিনি নতুন করে অনিয়মের একটি চক্র গড়ে তোলেন। এছাড়া দুই হাজার চব্বিশ ও দুই হাজার পঁচিশ সালের জুন মাসের হিসাব সমাপনীতে ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার বাবর অ্যাসোসিয়েটসকে জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দপ্তরের অস্ত্রাগার ভবনের তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে এইচবি ট্রেডার্স লিমিটেডকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের ভবনে গভীর নলকূপ স্থাপন, উপকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়।
এছাড়া প্যাসিফিক ইঞ্জিনিয়ার্সকে জেলা প্রশাসকের নথি সংরক্ষণাগার সংস্কারের দায়িত্ব এবং পূর্বাঞ্চল ট্রেডকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে রাজগঞ্জ পুলিশ সার্কেল ও আবাসিক ভবনের অবশিষ্ট নির্মাণকাজ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না। একই সঙ্গে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ব্যবহারকারী বিভিন্ন দপ্তর। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানকে সহায়তা করছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী কল্যাণ কুমার কুণ্ডু এবং উপবিভাগীয় বিদ্যুৎ ও যন্ত্র প্রকৌশলী মিজানুর রহমান আকন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন গ্রহণ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :