বেনাপোল কাস্টমসে ৪৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি: রনি-মাইদুল সিন্ডিকেট নিয়ে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে কারসাজি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস এবং পণ্য আত্মসাতের একের পর এক অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি এবং বগুড়ার মাইদুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি করছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের কথা জানিয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন পণ্য। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের ফল, শাড়ি ও থ্রি-পিস আমদানিও আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পণ্যের ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণা এবং দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, রাজস্ব ঘাটতির পেছনে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্কহারের পরিবর্তনের মতো কারণও রয়েছে। তা সত্ত্বেও শুল্ক ফাঁকি ও ওজন কারসাজি রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই হার ছিল ৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুল্কহার বৃদ্ধির পর কিছু অসাধু চক্র কম শুল্কে উচ্চ শুল্কের পণ্য ছাড় করাতে নতুন কৌশল অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিম্ন শুল্কের পণ্যের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাসের সুযোগ করে দেন। অতীতেও কাস্টমস ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী এ ধরনের একাধিক চালান জব্দ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ওজন পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে কম শুল্ক পরিশোধের সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। সহকারী কাস্টমস কমিশনার অটল গোস্বামীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৪ জুন বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য একই সময়ে দুটি পৃথক ওজন দেখানো হয়েছে। একটি নথিতে ট্রাকটির খালি ওজন ৪ হাজার ৮৮০ কেজি এবং অন্যটিতে ৪ হাজার ৯২০ কেজি উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাস্টমসের এক কর্মকর্তা জানান, ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়া চালানটি ছিল সাইকেলের যন্ত্রাংশের। পরে ২৫ জুন চালানটি আটক করে তদন্ত শুরু করা হয়। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্যের শেডকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয় এবং পরে সুযোগ বুঝে ধাপে ধাপে খালাসের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির নজির কম থাকায় একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটছে।

গত ১২ মার্চ ৩৭ নম্বর শেড থেকে বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন এ ঘটনায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ২৬ নম্বর শেডে ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৩৮৫টি উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করে কাস্টমস।

এর আগে ২৫ এপ্রিল আঙুরবোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাকের ক্ষেত্রেও ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি, কিন্তু ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। সে সময় দায়িত্বে থাকা ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি দাবি করেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।

জুন মাসে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক চারটি মামলা করেছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নামও রয়েছে। এছাড়া ২৭ জুন রাসায়নিক পণ্য সংরক্ষণ এলাকা থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে সেখানে শেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ায় প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শেডের ভেতর থেকে কীভাবে পণ্য বের হলো, সেটিও তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকৃত দায়ীদের বাদ দিয়ে তদন্ত করলে সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে না।

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, বেনাপোল দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আহরণকারী বন্দর। এখানে ওজন নির্ধারণে সামান্য অসঙ্গতিও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দরের স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারসাজি বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।

কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনযন্ত্রে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্তে কাস্টমস কর্মকর্তা, পণ্য খালাসকারী প্রতিনিধি, আমদানিকারক বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও করা হবে। তিনি জানান, বেনাপোল কাস্টমসে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। রাজস্ব সুরক্ষা ও স্বচ্ছ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হচ্ছে।

Advertisement

Link copied!