"টাকার গন্ধ" বড় অদ্ভুত। এটি নাকে গেলেই মানুষের সহজাত বিবেক স্থিমিত হয়ে যায়, মস্তিষ্ক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়। আর "টাকার গরম"? তা এমনই তীব্র যে, তা দিয়ে হিমশীতল সত্যকেও অনায়াসে গলিয়ে ফেলা যায়। এই দুইয়ের বিষাক্ত মিশ্রণে মানুষ যখন মত্ত হয়, তখন সে যেন এক ‘পাগলা ঘোড়া’—যে পাগলামিতে নীতি, নৈতিকতা আর মানবিকতার কোনো স্থান নেই। আমাদের সমাজে আজ যে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে, তার মূলে রয়েছে অর্থের এই সর্বগ্রাসী আধিপত্য। টাকা যেন এখানে একাধারে বিষ, আবার রক্ষাকবচও। অবৈধ উপায়ে উপার্জিত সেই টাকাই অপরাধীকে সমাজের চোখে ‘সম্মানিত’ করে তোলে।
দুর্নীতির আবর্ত: যখন ‘চোর’ই ‘মোড়ল’
সমাজতত্ত্বের ভাষায় দুর্নীতি হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এটি এখন একটি অলিখিত সমাজব্যবস্থা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন জনগণের করের টাকায় বেতন পাওয়ার পরও ফাইল সই করার জন্য ঘুষ দাবি করেন, তখন তিনি কেবল আইন ভাঙেন না, তিনি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলেই আঘাত করেন।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ঘুষের টাকা কেবল ওই কর্মকর্তার পকেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিকে তাকান—সেখানে কাজ পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হয়। সেই ঘুষের অর্থের ভাগিদার হন সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যও। ফলে, যখন কোনো সাহসী সাংবাদিক বা সচেতন নাগরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে যান, তখন পুরো চক্রটি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। যে দুর্নীতির টাকা সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েছে, সেই টাকার জোর তখন অপরাধীর জন্য ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করে।
ক্ষমতার পালাবদল: দুর্নীতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো, ক্ষমতার পালাবদলে দুর্নীতির স্বরূপ বদলায়, কিন্তু প্রকৃতি বদলায় না। যে দলটি বিরোধী দলে থাকার সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলা ফাটায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেখা যায় তারাই আগের দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার জন্য অর্থের নিরন্তর প্রয়োজন। তারা একে অপরকে রক্ষা করে এই অলিখিত চুক্তিতে যে—"আজ আমি তোমাকে বাঁচাব, কাল তুমি আমাকে বাঁচাবে।"
এর ফলে দুর্নীতিবাজদের একটি ‘সেফ জোন’ তৈরি হয়। তদন্ত কমিশন গঠিত হয়, ফাইল নড়াচড়া করে, পত্রিকার পাতায় বড় বড় হেডলাইন হয়, কিন্তু দিনশেষে সাজা হয় না। কারণ, দুর্নীতির শিকড় রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে গেছে যে, বিচার করতে গেলে পুরো ব্যবস্থার ধস নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
টাকার শক্তি: আক্রমণ ও আশ্রয়ের হাতিয়ার
অর্থের এই দ্বিমুখী রূপ সাধারণ মানুষের জন্য এক অভিশপ্ত দর্পণ। টাকা যদি আপনার পকেটে থাকে, তবে আপনি অনায়াসেই যেকোনো আইনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন। কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়ে তাকে হয়রানি করা থেকে শুরু করে, আদালতে ভুয়া সাক্ষী হাজির করা—সবই টাকার জোরে সম্ভব। টাকা থাকলে আপনি আক্রমণ করতে পারেন—আপনার প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে।
আবার টাকা থাকলে আপনি নিরাপদ। জেলখানায় গিয়ে দেখবেন, প্রভাবশালী অপরাধীরা হাসপাতালের কেবিনে এসির নিচে আরাম করছে, আর সাধারণ অপরাধী বিনা বিচারে পচছে। যার টাকা আছে, তার জন্য কারাগার হলো বিশ্রামের জায়গা; আর যার টাকা নেই, তার জন্য জেলখানাই শেষ পরিণতি।
দুর্বল কি সত্যিই পথহারা?
মানুষ যখন জিজ্ঞেস করে, "দুর্বলের কি তবে কোনো পথ নেই?", তখন উত্তরটি বেশ কঠিন। আইনের পাতায় লেখা থাকে—‘আইনের চোখে সবাই সমান’। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় এই উক্তিটি বর্তমানে এক নিষ্ঠুর রসিকতায় পরিণত হয়েছে। বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন এতটাই ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘসূত্রতার আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা অসম্ভব। বিচার পাওয়ার পথ এখন ‘আইনি’ নয়, বরং ‘অর্থনৈতিক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার পেছনে যদি প্রভাবশালী লবিং বা টাকা খরচ করার সামর্থ্য না থাকে, তবে সত্য হওয়ার পরও আপনি হেরে যেতে পারেন। এই পরিস্থিতির কারণেই সাধারণ মানুষ এখন বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা ভাবে, "বিচার চেয়ে কী হবে? উল্টো টাকাও যাবে, সময়ও যাবে, শেষমেশ জুটবে কেবল অপমান।"
দুর্নীতির মরণফাঁদ থেকে মুক্তির পথ: একটি কাঠামোগত রূপরেখা
দুর্নীতি যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, বরং পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এটি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক স্তরে কাঠামোগত সংস্কার।
১. সামাজিক আন্দোলন: নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙা সামাজিক আন্দোলনের মূল শক্তি হলো ‘গণজাগরণ’। দুর্নীতিবাজদের যখন সমাজ সম্মান দিতে শুরু করে, তখন তারা নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। আমাদের প্রথম কাজ হলো ‘সামাজিক বয়কট’। অতীতে অনেক উন্নত দেশে কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে তাকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা হতো, যা কারাদণ্ডের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। বাংলাদেশেও দুর্নীতিবাজদের সামাজিক অনুষ্ঠানে বর্জন করা বা তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
২. শিক্ষাব্যবস্থা: নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনার পুনর্জাগরণ আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সততার কথা থাকলেও তা কেবল পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ। শিক্ষাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। ‘দুর্নীতি ও তার কুফল’ এবং ‘নাগরিক দায়িত্ব’কে প্রাথমিক পর্যায় থেকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর মতো ‘যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন’ এবং ‘সততার পুরস্কার’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
৩. রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির প্রধান উৎস হলো ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং দুদককে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ রাজনীতির খরচ থেকেই দুর্নীতির বীজ উপ্ত হয়। নিউজিল্যান্ড বা ডেনমার্কের মতো রাজনৈতিক অর্থায়নের উৎস জনগণের সামনে স্বচ্ছ রাখা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক অর্থায়ন আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি।
৪. ধর্ম ও নৈতিকতার পুনর্মূল্যায়ন সব ধর্মেই চুরি, ঘুষ এবং অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। অথচ দেখা যায়, মানুষ ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি দুর্নীতিতেও লিপ্ত। দুর্নীতিকে কেবল অপরাধ নয়, বরং একটি ‘পাপ’ বা ‘অধর্ম’ হিসেবে প্রচার করতে হবে। ধর্মকে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে সামাজিক ও নৈতিক সততার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়: একটি রোডম্যাপ
বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতিকে কেবল মুখের বুলি নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।
• ডিজিটালাইজেশন: সরকারি সব সেবা অনলাইনে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ যত কমবে, ঘুষ লেনদেনের সুযোগ তত কমবে। ই-গভর্ন্যান্স এক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
• উুইসেলব্লোয়ার প্রোটেকশন: যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথ্য দেবে, তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। মানুষ ভয় পায় কারণ সে জানে, তথ্য দিলে সে নিজেই বিপদে পড়বে। এই ভীতি দূর করার জন্য শক্তিশালী ‘তথ্যদাতা সুরক্ষা আইন’ প্রয়োজন।
• বিচার প্রক্রিয়ার দ্রুতায়ন: বিচারহীনতার সংস্কৃতির চেয়ে বড় অভিশাপ আর কিছু নেই। দুর্নীতির মামলার জন্য আলাদা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে, যেখানে মামলার রায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্যকর করা বাধ্যতামূলক।
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ রাতারাতি তৈরি হয় না, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। যে সমাজ দুর্নীতিবাজকে ‘চোর’ বলতে ভয় পায় না, সেই সমাজই কেবল মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারে। আমরা কি প্রস্তুত আমাদের ব্যক্তিগত আরাম আর সুবিধা বিসর্জন দিয়ে একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য লড়াই করতে? এই উত্তরটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের ভিশনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ দুর্গম হলেও অসম্ভব নয়, যদি আমরা সচেতনতা, সাহস এবং নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।
(লেখক—জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)

আপনার মতামত লিখুন :