জাল মুদ্রা দমনে কঠোর আইন, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:২১ এএম

জাল মুদ্রা দমনে কঠোর আইন, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন

সরকার দেশে জাল মুদ্রা প্রস্তুত, মজুত, ব্যবহার, কেনাবেচা, পরিবহন ও পাচারসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবিত আইনে গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পদের অর্থমূল্যের দ্বিগুণ অথবা ন্যূনতম এক কোটি টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, পুলিশের পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর নির্ধারিত কর্মকর্তারা যৌক্তিক সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি চালাতে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবেন। একই সঙ্গে জাল মুদ্রা, মুদ্রা তৈরির যন্ত্রপাতি, কাগজ, কালি, রাসায়নিক দ্রব্য, কম্পিউটার, স্ক্যানার, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামসহ সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করার ক্ষমতাও থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে প্রচলিত মুদ্রার আদলে জাল নোট তৈরি, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও লেনদেনের মতো অপরাধের শাস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং বৈধ মুদ্রা ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করতেই নতুন আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অন্য কোনো আইনের সঙ্গে এই আইনের বিরোধ সৃষ্টি হলে নতুন আইনের বিধানই কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কমিটি

খসড়া আইনে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। পাশাপাশি জাল মুদ্রা প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী, পাচারকারী এবং ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কিত একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত সরবরাহ করবে।

যেসব কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে

খসড়া আইনে জাল মুদ্রা তৈরি, তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, জেনেশুনে জাল মুদ্রা সংরক্ষণ, কেনাবেচা, ব্যবহার, গ্রহণ কিংবা আসল মুদ্রা হিসেবে প্রচলনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জাল মুদ্রা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা অন্যান্য উপকরণ উৎপাদন, সংগ্রহ, বিক্রি, ব্যবহার, আমদানি, রপ্তানি, বহন বা দখলে রাখা অপরাধ হবে। জাল মুদ্রা তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন, এ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় এবং সেই তথ্য বা উপকরণ অবৈধ উদ্দেশ্যে সংরক্ষণও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিদেশ থেকে দেশে কিংবা দেশ থেকে বিদেশে জাল মুদ্রা পাচার, বিকৃত বা পরিবর্তিত মুদ্রা লেনদেন এবং এমন মুদ্রাসদৃশ বস্তু তৈরি, যা দিয়ে মানুষ প্রতারিত হতে পারে, সেগুলোকেও অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।

পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতার

খসড়া অনুযায়ী, পুলিশের উপপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর পেটি অফিসার বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা যৌক্তিক সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়াই কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি ও অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।

অভিযানের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং জাল মুদ্রা, নগদ অর্থ, ব্যাংক কার্ড, কম্পিউটার, স্ক্যানার, কাগজ, কালি, রাসায়নিক দ্রব্য ও অন্যান্য উপকরণ জব্দ করা যাবে। অন্য কোনো বাহিনী জব্দ বা গ্রেফতার করলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করতে হবে।

মামলা ও তদন্তের বিধান

পুলিশ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, তাদের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ-সংক্রান্ত মামলা করতে পারবেন।

হাতেনাতে গ্রেফতারের ঘটনায় ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় বাড়ানো যাবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত অতিরিক্ত সময় দিতে পারবেন। তদন্তে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আদালত প্রয়োজন হলে নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারবেন এবং তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক কারণে তদন্ত কর্মকর্তাকে বদলি করা যাবে না।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও ডিজিটাল সাক্ষ্য

জব্দ করা মুদ্রা জাল কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার, অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অথবা সরকার নির্ধারিত অন্য কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান মতামত দিতে পারবে। কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মুদ্রাকে জাল বা আসল বলা হয়েছে, সেটিও উল্লেখ করতে হবে।

ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র, শব্দরেকর্ড, দূরভাষ আলাপ, বিদ্যুৎবার্তা, ইন্টারনেট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত তথ্য আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।

শাস্তির বিধান

খসড়া আইনে গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পদের দ্বিগুণ অর্থমূল্য অথবা এক কোটি টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

জাল মুদ্রা বা বৈধ মুদ্রা নিয়ে জেনেশুনে গুজব ছড়ালে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মুদ্রাসদৃশ প্রতারণামূলক বস্তু তৈরির অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।

অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করলে মূল অপরাধীর মতো একই শাস্তি ভোগ করতে হবে।

জামিন, বিচার ও আপিল

খসড়া অনুযায়ী, এ আইনের অধীন সব অপরাধ হবে আমলযোগ্য, অমীমাংসাযোগ্য ও অজামিনযোগ্য। মামলার বিচার করবেন দায়রা জজ আদালত অথবা মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রায় ঘোষণার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন।

উপকরণ নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ

সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাল মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন, সংরক্ষণ, কেনাবেচা, সরবরাহ এবং আমদানি-রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিধি ও প্রবিধান জারি করা হবে।

কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব

অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জাল মুদ্রা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। তাই কঠোর আইন প্রণয়ন সময়োপযোগী হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাল মুদ্রা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। কঠোর আইন ইতিবাচক হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর মতে, দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

সিয়াম সরিষা
Link copied!