গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে একাশি ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার বিকেলে ঢাকার মহানগর হাকিম রিপন হোসেন এ আদেশ দেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস নিজেকে সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও ব্যবসার আড়ালে দেশি ও বিদেশি অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর এবং হুন্ডি কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে তার নামে থাকা পাঁচটি ব্যাংক হিসাব এবং চারটি মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে বিভিন্ন সন্দেহজনক উৎস থেকে নয় কোটি পঁয়ত্রিশ লাখ বত্রিশ হাজার চারশ একান্ন টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব অর্থের বড় অংশ বৈধ ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, রোববার রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি পলাশবাড়ীর মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। পরে তারা হরিদাসকে বাইরে ডেকে এনে হাতকড়া পরিয়ে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরোয়ার আলম খান বলেন, ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের কোমরপুরের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত গোপীনাথ চন্দ্র তরণী দাসের ছেলে। উনিশশ একানব্বই সালে তার জন্ম। তার তিন ভাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ভারতে যান। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিকস বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। পরে দেশে ফিরে তার কর্মকাণ্ডে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রভাব দেখা যায় বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
দুই হাজার দশ সালে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পুরোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামতের কাজ শুরু করেন তিনি। গোয়েন্দা সংস্থার নথি অনুযায়ী, দুই হাজার উনিশ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাওহীদ ইসলাম নাম ব্যবহার শুরু করেন। একই বছরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার এক তরুণীকে বিয়ে করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, একসময় রোহিঙ্গা শিবিরকেন্দ্রিক কথিত ব্যবসায় জড়িত থাকার সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে সে পরিচয় কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে নিজের প্রভাবের কথা প্রচার করতে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের তোলা ছবি ব্যবহার করে তিনি চাকরি, বদলি, দরপত্রসহ নানা কাজে প্রভাব খাটানোর আশ্বাস দিতেন। এতে প্রলুব্ধ হয়ে বহু ব্যক্তি তার কাছে আর্থিক লেনদেন করেন। এভাবে তিনি বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই হাজার আঠারো সালে প্রতারণার এক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
চলতি বছরের জুন মাসে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে দেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন হরিদাস। পরে ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।

আপনার মতামত লিখুন :